29 Jun 2026

" আমাদের জয়া রোদ্দুর হতে  পেরেছিল "

*******************************

আমাদের জয়া মানে  কৃষ্ণা  বন্দ্যোপাধ্যায়  এর সাথে আমার পরিচয় প্রেসিডেন্সি জেলে। তখন আমরা  জনা আট / নয়  ভেতরে। বাম রাজনীতির প্রভাব ওদের পরিবারে ছিল। নকশাল বাড়ী ঘটার আগে বাম প্রার্থীদের হয়ে প্রক্সি ভোট দিতে গিয়ে পরিচিত পাড়াতুত জ্যাঠা /কাকাদের হাতে পড়তে পড়তে পালিয়ে আসে, তার কিছু মজার গল্প আমরা শুনেছি। খুব সম্ভব কলেজ পাশ করার পর নকশাল বাড়ী ঘটে। ও অমর শহীদ  দ্রোণাচার্য্যদের  সাথে  সি পি আই এম এল পার্টির সাথে  যুক্ত হয়। ধরা পড়ার আগে পর্যন্ত পার্টির একনিষ্ঠ কর্মী ছিল। 

আমাদের জয়ার রাজনৈতিক জীবন নিয়ে অনেকেই লিখেছেন। আমি তাই আমাদের কিছু ঘনিষ্ট সময় ও ওঁর একান্ত ব্যক্তিগত গুণগুলি কে তুলে ধরতে চাই। জয়ার গানের গলা ছিল খুব সুন্দর। মিষ্টতার সাথে দৃঢ়তার মিশ্রণ। তাছাড়া অভিনয় ও পাঠ ইত্যাদি তে দারুণ দক্ষ ছিল। পরিষ্কার ভাবে নিজের  বক্তব্য রাখতে পারদর্শী, কোন মিটিং বা প্রোগ্রাম পরিচালনা তে অসম্ভব দক্ষ ছিল। অসাধারন দখল ছিল সাহিত্য সৃষ্টিতে। ঝরঝরে, সুললিত ভাষায়  দক্ষতার সাথে যে কোন ধরনের লেখা লিখতে পারত। তাই ইচ্ছা করলেই ও ভাল কন্ঠ শিল্পী, অভিনেত্রী বা বাচিক শিল্পী হতে পারত, ভাল সাহিত্যিক হতে পারত। কিন্তু রাজনীতি টাই ওর শিরায় শিয়ায় বইত।      

আর একটি গুন্ ছিল জয়ার, সুক্ষ রসবোধ। মহাদেব মুখার্জীর অধঃপতনের পর পার্টি দুভাগ হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ সম্পর্কে আবদ্ধ দুজন সাথী বিপরীত শিবিরে চলে যায়। বিশেষ সম্পর্ক  গুলি র মধ্যে ভাঙচুর  শুরু হয়। এই ধরনের একটি ঘটনাতে আমাদের একজনের মাকে জয়া হটাৎ গম্ভীর মুখে বলে ওঠে," মাসিমা দাদাভাই কে বলুন এখন বিশেষ কেউ মহাদেব করছে না , মহাদেব নিজেও আর মহাদেব করছে না। " সবাই হেসে ফেলে , পরিস্থিতি একদম পাল্টে যায়। 

জেলের খাবার খেয়ে সবাই অল্পবিস্তর পেটের সমস্যাতে ভুগতে। জয়া অম্বল হলেই  একহাতে পেটে হাত বোলাত আর  অন্য হাতে পাখা দিয়ে পেটে হাওয়া করত। শেষে খুকু টেনে ধরে শুইয়ে তেলজল মিশিয়ে মালিশ করে দিত। জল খেতে চাওয়ায় আমি জল দেবার জন্য ওর হাতে একটা গ্লাস দিয়ে বাটি থেকে যেই জল ঢালতে যাই অমনি গ্লাস টা গোল করে ঘুরিয়ে চলে।  শেষে ধমক দিয়ে বলি ,"এমনি করলে তোকে জল  দেব কি করে। " 

কত ঘটনা যে মনে পড়ছে। হটাৎ জয়াকে হুগলী জেলে নিয়ে যাবে বলে নোটিশ এল।  আমরা মেয়াদী মাসিদের কাছ থেকে গুড়াকু এনে জয়াকে দাঁত মাঝ্তে বললাম। দাঁত মাজার ফলে জয়ার বুকের প্যালপিটিশন শুরু হল। তখন  ওকে শুইয়ে দিয়ে ওয়ার্ডার মাসিদের ডেকে দেখানো হল। আর রাজশ্রী তার প্রসিদ্ধ বাংলা ভাষায় বোলতে শুরু করল ," মাসি, দেখ জয়ার তো একেবারে এখন তখন অবস্থা। "একটা গুরুগম্ভীর পরিবেশ সৃষ্টি করতে গিয়ে আমরা বাকিরা তো বিষম খেয়ে অতি কষ্টে হাসি চাপি। রুগীর অবস্থা সত্যি করেই মহা বিপদজনক হয়ে ওঠে। এদিকে রাজশ্রী নির্বিকার ভাবে তার বক্তব্য বলেই চলেছে , সব ধাক্কা , চিমটি আর ইশারা ওর মাথার ওপর দিয়ে বেড়িয়ে যাচ্ছে। 

আমাদের সকলের মধ্যে এমন ঘনিষ্টতা ছিল যে আমরা প্রত্যেকে প্রত্যেকের জীবনের কথা, বাড়ীর কথা জানতাম। এই কারণেই জয়ার ছোট ভাই ভিয়েতের নামকরনের গল্প ও জানি। দ্রোণ ভিয়েতের নাম রাখে স্ফুলিঙ্গ, জয়া রাখে ভিয়েত। ছোট বেলায় ভিয়েত স্ফুলিঙ্গ উচ্চারণ করতে পারত না ,ইসফুলিঙ্গ বলত। এখন অবশ্য ও সবকটা নাম ই ব্যবহার করে।  

একটা সময়ে যখন পার্টির ব্যাপক ক্ষয় ক্ষতি হয়, সি পি আই এম এল পার্টি লিনপন্থী আর লিনবিরোধী দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায় ,তখন জয়া একটা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। একটা সময় যোগাযোগ রক্ষা করার কাজে যুক্ত থাকা  এবং দীর্ঘদিন পার্টি সংগঠনের কাজে যুক্ত থাকার ফলে ওঁর  পশ্চিমবাংলার বেশ কিছু এলাকার যোগাযোগ ছিল। জয়া মহাদেবকে সাথে নিয়ে সেই সব যোগাযোগ গুলি করিয়ে দেবার ফলে পার্টি পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে খুব সুবিধা হয়। 

মজার কথা হল মহাদেব যখন ধরা পড়ার পর চূড়ান্ত কাপুরুষের ভূমিকা নেয়, আমরা জয়াকে খুব খেপিয়ে ছিলাম এই বলে ,"তুই হলি যত নষ্টের গোড়া। তোকে কে মাথার দিব্যি দিয়েছিল মহাদেবকে সব যোগাযোগ করিয়ে দিতে। ও বেচারা র মত মুখ করে হাসতো। 

বন্দিমুক্তির পর আমরা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ি।  সবাই নিজ নিজ পরিস্থিতি ও চিন্তা ভাবনা অনুসারে কাজ কর্ম শুরু করে , সাথে নানা সামাজিক কাজ রাজনৈতিক কাজ করতে শুরু করে। পারস্পরিক দেখা সাক্ষাৎ না হলেও অন্তরের টান এত টুকু চিড় খায়নি। মাসিমা, মলয়া, বৌমা ,মীনাক্ষি আগেই চলে গেছে। এবার জয়াও আমাদের ছেড়ে চলে গেল। বয়স ভারে আর সংখ্যা প্রায় শেষ হতে বসেছে বলেই এই বিচ্ছেদ টা কিছুতেই মানতে পারছিলাম না , পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম।  অনেক কষ্টে আজ ওকে মনে করে সামান্য কিছু লিখতে চেষ্টা করলাম।  

জয়ার কথায় এটাও বলা দরকার মনে হল। জয়া ছিল রত্নগর্ভা। ওর  ছেলে বাবুন আর ছেলের বউ শ্রীনু খুব আদর আর যত্ন দিয়ে জয়া কে অনেক কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে পার করে নিয়ে এসেছে, বাঁচিয়ে রেখেছিল ।


জয়া বার হবার পর থেকে বিভিন্ন গণসংগঠন আর গন  আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ও কোন  চাকরী করতে ইচ্ছুক ছিল না। কিছু খুচরো কাজ আর প্রুফ রিডিং এর কাজ ছাড়া নানা সামাজিক ও রাজনৈতিক কাজে যুক্ত থাকতে চেয়েছিল। হাজার শারীরিক অসুবিধা নিয়ে ও সব সময়  কোন মিটিং বা কাজে গরহাজির হয়নি।  রাজনীতি ওঁর জীবনের একমাত্র কাজ হিসাবে ধরে নিয়ে ছিল। আর সেটাই ও করে গেল।  সেইজন্য ই বলছি , আমাদের জয়া / কৃষ্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় রোদ্দুর হতে চেয়েছিল , আর সত্যিই  ও রোদ্দুর হতে পেরেছে।