11 Sept 2016

জেনানা ফাটকের ইতিবৃত্ত - পর্ব 3

জেনানা ফাটকের ইতিবৃত্ত - পর্ব  ৩
************************

কল্পনা ধরা পড়েছিল যদুগোড়া জঙ্গল থেকে, শ্রদ্ধেয় অনন্ত সিংহের গ্রূপের বেশ কিছু জনের একটা দলের সাথে। ও আমাদের সকলের মধ্যে  সবচেয়ে বেশী দিন জেলে কাটিয়েছিল । অসম্ভব সাহসী আর দৃঢ় চেতা ছিল। মুক্তি শান্ত শিষ্ট  অথচ দৃঢ় প্রতিজ্ঞ স্বভাবের মেয়ে, ধরা পড়ে  '৭১সালে। ডালিয়া ছিল ডাকাবুকো। আর বিজু ছিল প্রাণ শক্তিতে ভরপূর উচ্ছল একটা বাচ্চা মেয়ে, কিন্তু দারুন মনের জোর, দেখলে বিস্মিত হয়ে যেতে হয়।ও ধরা পড়ে  '৭২সালের প্রায় শেষের দিকে।জয়া ধরা পড়ে সম্ভবত পুরুলিয়া থেকে। শীলাদি দের পাঁচজনের মধ্যেও সাহসের অভাব ছিল না, তারাও '৭২/ ৭৩ সালে ধরা পড়ে।
--
কল্পনা/ ডালিয়াদের মুখে গল্প শুনেছি, '৭০/৭১ সালের প্রথম দিকে কল্পনা কে প্রথমে একতলায় ঠান্ডা স্যাৎসেতে একটা সেলে রেখেছিল। তখন অনেক মেয়ে ছিল। তাদের রাখা হয়েছিল মেয়াদী নম্বরে। সবাই মিলে ঠিক করে ওকে যখন স্নান করাতে বার করবে তখন জমাদারনিদের হাত থেকে কেড়ে ওয়ার্ডে নিয়ে আসবে। সাধারণ কিছু বন্দিনী তাতে সামিল হয়। যথারীতি পরিকল্পনা মাফিক কাজ হয়। মেয়ে জমাদারনীরা সাহস পায়না। ফলে জেলারের নেতৃত্বে জমাদারদের বিশাল ফোর্স আসে। অসম শক্তির মধ্যে লড়াই শুরু হয়। সবাই কে অবাক করে শিখা বলে সবচেয়ে সক্রিয় বন্দিনী প্রথমেই দল বদলে জমাদারদের হাত থেকে লাঠি নিয়ে মেয়েদের মারতে শুরু করল।
--
অতি সহজেই জেল কতৃপক্ষের সুনজরে এসে সে দালালদের রানী হয়ে বসল। পরবর্তী কালে গোবেচারী জমাদারনীরাও তাকে তোয়াজ করে চলত। যাইহোক আমাদের মেয়েরা লড়াই করল, সকলেই প্রচন্ড আহত হল। কল্পনা, জয়া, ডালিয়া আর সীমাকে সেলে বন্দী করে দিল। বাকীদের মেয়াদী নম্বরে। আমি '৭৩এর প্রথমে ধরা পরি। তখন সেই গ্রূপটার কল্পনা, সীমা, ডালিয়া, জয়া ছাড়া সবাই ছাড়া পেয়ে গেছে। বাকী সকল কে শীলাদিদের সাথে ডিভিশন ওয়ার্ডে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। সীমাকেও সেল থেকে ডিভিশন ওয়ার্ডে দেওয়া হয়েছিল।
 --
সাধারণ বন্দিনী দের মেয়াদী নম্বরে দেওয়া  হল। আমাদের ওয়ার্ডের বাইরে একটা প্যাসেজ ছিল। সেখান থেকে মেয়াদী নম্বরের জানালা দিয়ে সাধারণ বন্দিনীদের সাথে কথা বলা যেত। তার পাশেই ছিল হাসপাতাল। সেখানে মেট্রন আর  ডাক্তারবাবু দের বসার কথা, তাছাড়া রুগীদের থাকার কথা। কিন্তু সেখানে শিখা তার পেয়ারের দালালদের নিয়ে ঘাঁটি গেড়েছিল। আমাদের প্যাসেজ থেকে ওদের কারসাজি আমরা লক্ষ রাখতাম। একজন পাহারায় থাকতাম অন্যরা সাধারণ বন্দিনী দের সাথে গল্প করতাম।
--
মহিলা ওয়ার্ডের ভেতর দিকটা এক কোনে সেল এর সামনে একটা ছোট্ট ভাটিঘরে  বড় দুটো চুলা ছিল। সেখানে গরম জল, বন্দিনীদের সপ্তাহে একদিন কাপড় সেদ্ধ ছাড়াও, মেট্রন আর দালাল দের জন্য রুগীদের ডায়েটের থেকে চুরি করা খাবার দিয়ে মুখরোচক খাবার বানানো হতো। ভাটি ঘরের দুপাশে দুটি আগেকার দিনের ভারী দরজা। আমাদের দিকের দরজা টা সাধারণত বন্ধ থাকত।সেলের দরজাও প্রয়োজন ছাড়া খোলা হত না। 
--
কত মানুষের সাথে পরিচয় হত। পয়সার অভাবে যারা তদবির করতে পারতোনা,বছরের পর বছর তারা জেলে পচে মরতো। মীরা ছিল এক সিধা সরল ধর্ষিতা মা। তার ধর্ষক বাইরের দুনিয়ায় বহাল তবিয়তে ঘুরছে। আর সে একটা হাড় জিরজিরে বাচ্ছা নিয়ে অন্ধকূপে পড়ে আছে। আর এক মীরা বাংলা দেশের মেয়ে, দাঙ্গার সময় পালিয়ে এসে পথ হারিয়ে জেলে আসে। হাসিনা সুন্দরবন থেকে কাজের জন্য কলকাতায় এসে রাস্তা হারিয়ে ফেলে।শেয়ালদা স্টেশনে পৌঁছে দিলেই সে বাড়ী চলে যেতে পারত। জাহানারা ৯/১০ বছরের বাচ্চা মেয়ে ও ধর্ষিতা। ধর্ষক পয়সার জোরে খোলা আকাশের তলে।শুধু অসহায় মেয়ে গুলি ভিক্টিম হিসাবে সরকারী সেফ কাস্টডির অন্ধকূপে বন্দী। কেউ বন্দী চুরি না করেও চুরির অপরাধে। সবচেয়ে হাস্যকর, চুরি না করে কেউ যদি করেছে বলে স্বীকার করে নেয়,তবে ৫/৭ দিনের সাজা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। আর কেউ যদি আত্মমর্যাদাবোধে  মিথ্যা অপবাদ অস্বীকার করে ,তাকে জেলে পচে মরতে হয়। ভালবাসার অপরাধেও জেলে থাকতে হয়। জেলে না এলে জীবনে এত অভিজ্ঞতা হতোই না।
--
 এর মধ্যে মুক্তি মিসা থেকে মুক্তি পেয়ে চোখের জলে বিদায় নিল। মিনু আমাদের ওয়ার্ডে এল। একদিন বৃস্টির দিন খুব চা খাবার ইচ্ছা হল। আমরা পুরান কাপড়ে আমাদের সেই বিখ্যাত উকুন তাড়ান তেল ঢেলে যে সামান্য চা পাতা ছিল তাই জলে দিয়ে অনেক ফুটিয়ে চা তৈরী করলাম, অমনি কোন কোনা থেকে একটা নেংটি ইঁদুর লাফ মেরে ফুটন্ত চায়ে পড়ে  নিজের পঞ্চত্ব প্রাপ্তি ঘটালো আর আমাদের চায়ের দফারফা। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো এক দশাসই জমাদারনি লক আপের কাছে এসে জিজ্ঞাসা শুরু করল "কে আগুন জ্বালিয়েছে ?" কেউ পাত্তা না দেওয়াতে, চাবি আনতে গেল, ঘরে ঢুকে দেখার জন্য। এই অবসরে বিজু গরম চায়ের বাটি ধরে গরাদের ফাঁক দিয়ে নর্দমায় ফেলে দিল, আমি পোড়া ন্যাকড়া গুলি আধা পাঁচিল দেওয়া যে বাথরুম ছিল তার লোহার প্যানে ফেলে জল ঢেলে চাপা দিয়ে দিলাম। জমাদারনী দরজা খুলে কিছুই দেখতে পেলনা। সন্দিগ্দ্ধ দৃষ্টিতে বাথরুমের প্যানের দিকে তাকিয়ে বক বক করতে করতে ফিরে গেল। এদিকে আমাদের দুজনের হাতের অবস্থা খারাপ।অনেকক্ষন জলে হাত ডুবিয়ে বসে থাকলাম।
--
এরমধ্যে আমাকে কোর্ট থেকে আবার ১৪দিনের জন্য লালবাজারে নিয়ে যাওয়া হল আবার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আর  জেলের গোপন খবরের জন্য।" আপনাদের লৌহবেষ্টনীর মধ্যে আটকে রেখে আমাকে গোপন খবরের জন্য জেরা করছেন! আপনাদের ফোর্স ছাড়াও তো দালাল বাহিনী রয়েছে খবর দেবার জন্য।" ব্যাস এক প্রস্থ মার। সেন্ট্রাল লক আপে গিয়ে দেখি বরানগরের বহুদিনের ওয়ান্টেড একটি মেয়ের পেছনে এমন মেরেছে ,এক/দু  মাস পুলিশ হাসপাতালে রেখেও ঘা পুরো সারেনি। অথচ মেয়েটি বহুদিন আগেই পার্টি ছেড়ে দিয়ে বিয়ে করে রীতিমত ঘর সংসার নিয়ে ব্যস্ত ছিল। আমাকে মিসা দিয়ে জেলে ফেরত পাঠাল। ওই মেয়েটিকে পরে কদিনের জন্য জেলে পাঠিয়েছিল। তারপর ছেড়ে দেয়। 
--
রাজনৈতিক বন্দীদের জেল কতৃপক্ষ বা দালাল রা সচরাচর ঘাটাতো না, প্রাপ্য জিনিসপত্র কিছুটা হলেও দিত। কিন্তু সাধারণ বন্দিনীদের দুর্দ্দশার সীমা ছিল না, এদিক ওদিক হলেই মারধর। শুধু খাবার কেন, খাবার জল টাও ঠিকমত জুটতনা। অসুখ বিসুখে ওষুধ পত্র ও মিলত না। আমরা চেষ্টা করতাম যাতে ওরা একজোট হয়ে নিজেদের দাবী গুলি আদায় করতে পারে। একজোট হয়ে দালালদের মারধোর ঠেকাতে পারে। দালাল রা সব সময় চোখে চোখে রাখত যাতে আমাদের সাথে ওরা কথা বলতে না পারে।কিন্তু তাই বলে জেলে লড়াই কখন থেমে থাকেনি। অন্যান্য বন্দিনীদের লড়াইয়ের পাশে আমরা সব সময় থাকতে চেষ্টা করেছি ,তাঁরাও আমাদের পাশে থাকতে চেষ্টা করেছে। কখন লড়াই শুরু করেছে মীরা,শান্তিবাই,বেলা,রেখারা , কখন মিতা, হাসিনা, হাওয়া বিবি, শোভা, শান্তি মাসীর। কখন বার্মিজ মাসীরা রুখে দাঁড়িয়েছে, কখন মেয়াদী নম্বরের পাকিস্তানের পাসপোর্ট কেসের মাসীরা, আবার কখন মাস্তান একাই জেলকতৃপক্ষের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবারে জীবন বাজী রেখে লড়ে গেছে।       
--
একদিন কথা বলতে বলতে একটু বেখেয়ালী হয়ে পড়াতে কয়েকটা দালাল আমার চুল আর কাপড় টা টেনে ধরে। আমি নিজেকে ছাড়াতে ছাড়াতে চীৎকার করে বিজু কে ডাকতে থাকি।  বিজু দৌড়ে আসে, দুজনে মিলে টানাটানি করে নিজেকে ছাড়াই। এদিকে মেট্রনের নির্দ্দেশে হেডজমাদারনি আমাদের দরজা টা খুলে শিখা আর তার দালাল বাহিনী কে ঢুকিয়ে দেয়। প্রথমেই আমাদের চশমা দুটো ভেঙে দেয়। আমার চোখের পাওয়ার মাইনাস ১৪। চশমা খুললে আমি কিছুই দেখতে পেতাম না। আমাকে কজন চেপে ধরল।
--
তারা মূল টার্গেট করল বিজুকে। সবাই মিলে ওর চুল ধরে ঘুষি,থাপ্পড় মারতে লাগল। ইতিমধ্যে শীলাদিরা সবাই বার হয়ে ওদের ওপর চড়াও হল। এমনকি দরজা খোলা পেয়ে মীরা, শান্তিবাই রা প্রায় জনা ১৫ সাধারণ বন্দিনীরা ঢুকে দালাল বাহিনী কে আক্রমণ করল। ওরা এতটা ভাবতে পারেনি। কাজেই তাড়া তাড়ি পগারপার। জমাদারনী দরজায় তালা লাগিয়ে দিল। প্রায় দিন ১০/১৫ সাধারণ বন্দিনীরা আমাদের সাথে থাকল। তারপর ওদের হাজতি নম্বরে ফিরিয়ে দিল।
--
এর কদিন বাদে ডালিয়াকে ১০ বছরের সাজা দিয়ে ডিভিশন ওয়ার্ডে নামিয়ে দিল আর জয়া কে পুরুলিয়া পাঠিয়ে দিল। শীলাদিরা  সবাই এক এক করে ছাড়া পেয়ে গেল। বিজু, মিনু ,ডালিয়া আর আমি রইলাম ডিভিশন ওয়ার্ডে। কল্পনা একা সেলে। এর কদিন পরে বিজুর মিসা উঠে গেল , ওকে অনেকের সাথে এন্টালি কনস্পিরেসি কেসে ঢুকিয়ে দিল, আর লালবাজারে নিয়ে গিয়ে একপ্রস্থ অত্যাচার ও হল।  আমাদের মাঝে  ফিরে এলো সেই অত্যাচারের চিন্হ নিয়ে।
*********************************************************************************
(চলবে)
 
















9 Sept 2016

জেনানা ফটকের ইতিবৃত্ত - পর্ব 1 & 2

জেনানা ফাটকের ইতিবৃত্ত - পর্ব ১ & ২
*******************************
প্রায় একমাস লালবাজারের লক আপে ভিন্ন ভিন্ন নামে রেখে অবশেষে আমাদের ১৫/২০ জনের দলটাকে রাইফেল ধারী গার্ড দিয়ে শেয়ালদা কোর্টে নিয়ে যাওয়া হল। প্রতি দিনের শারীরিক ও মানষিক অত্যাচারে সকলেই অল্প বিস্তর বিদ্ধস্ত। দলের মধ্যে আমি ছিলাম একমাত্র মেযে। সকলেই আমার দিকে স্নেহপ্রবণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো। এরপরে আমার সাথে দেখা হবার সুযোগ হয়ত হবেনা। সময় ১৯৭৩ সাল, বেলা ১০ টা।
--
কোর্টে আমাকে মহিলা লক আপে ঢুকিয়ে দেওয়া হল, বাকিদের ছেলেদের লক আপে। বহুদিনের সুখদুঃখের সাথীদের সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল। ছোট্ট নোংরা ঘরটায় একটা মাত্র জালের বিশাল একটা তালাবন্ধ দরজা। প্রায় আত্মবিস্মৃত অবস্থায় একটা কোণে দাঁড়িয়ে ছিলাম, হটাত কে যেন ডাকল,"এই রীতা, এদিকে আয়, এইযে এই দিকে।" সম্বিত ফিরে পেয়ে তাকিয়ে দেখি অন্য কোণে মিনু বসে আছে। ওর কাছে গিয়ে বসলাম। ভাল করে খেয়াল করে দেখি ওর পাদুটো গোদের মত ফোলা।
 --
লালবাজারে পাকানো বাঁশের লাঠির বারি মেড়ে হাত পা ফুলিয়ে দিয়ে একরকম তেল লাগিয়ে দিত যাতে ওপর থেকে ফোলা কমে যেত, ভেতেরে জখম খুব কিছু কমতো না। সেটা নাকি বন্দুক পরিস্কারের তেল। বুঝলাম মিনুর ভাগ্যে তাও জোটেনি। ও কিন্তু একান্ত ভাবেই ঘরোয়া মেয়ে ছিল। কোন কালে কোন রাজনীতির সাথে কোনভাবেই যুক্ত ছিল না, ওর ভাই বোনরা হয়ত ছিল। তাদের না পেয়ে ওকে আর ওর বাবাকে ধরে এনেছে।
--
দেখলাম ওকে উল্টো করে ঝুলিয়ে শুধু বেধরক মারই মারেনি বুক পিঠে জলন্ত সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়েছে। দিন সাতেক মানিক তলা থানায় রেখেছিল। মাস কয়েক আগেও একবার ওর বাড়ীতে ভাইবোন দের তল্লাশ করে না পেয়ে ওকে ধরেছিল। সেবার শুধু জিজ্ঞাসা বাদের উপর দিয়ে গেছিল। এবার তাই বোদহয় তিন গুন শোধ নিয়েছে। ওকে দেখে একদিকে যেমন ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল, অন্যদিকে নিজে নূতন করে শক্তি সঞ্চয় করছিলাম।
--
একটুপরেই একদল বন্দীকে সেখানে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। তারমধ্যে একজন চশমা পরা মহিলা ছিলেন। সে আমাদের মতই রাজনৈতিক বন্দী, মাস কয়েক আগে থেকেই জেলে বন্দী আছে। মিনু আগে একবার ধরা পড়ার সূত্রে তাকে চিনত। নাম শীলা, কোন এক কলেজের অধ্যাপিকা। আলাপ পরিচয় হলো। শীলাদির বাবা বাড়ী থেকে খাবার এনেছিলেন। তার থেকে আমাদের কিছুটা দিল, মিনু আর আমি বুভুক্ষুর মত গিললাম, যেন কতকাল পরে আপনজনের মাঝে এসে পুলিশ থানায় হারানো ক্ষিদে তৃষ্ণা আমাদের ফিরে এসেছে।
--
বিকাল পাঁচটার পর কোর্ট বন্ধ হয়ে গেল। আমাদের কাউকেই বিচারকের সামনে তোলা হলনা। পরে শুনেছিলাম আমাদের নামে রায়ট, খুনজখম ইত্যাদির জন্য বিভিন্ন ধারায় কেস রুজু করা হয়েছে।  আমাদের পুলিশ ভ্যান এ তোলা হলো। মিনু হাঁটতে পারছিলো না।  আমি সাহায্য করতে গেলে শীলা দি বললো," তুই পারবি না, আমি দেখছি," বলে তাকে কোলে তুলে ভ্যান পর্যন্ত নিয়ে গেল, সাধারণ বন্দিনীদের সাহায্যে উপরে তুললো। আমাদের সবাইকেই গার্ড দিয়ে ভ্যানে তোলা হলো।
--
ভ্যান চলতে শুরু করল। খুপরির ভিতর থেকে বাইরে টা দেখছিলাম। রাস্তায় আলো জ্বলছে। লোকজন ব্যস্ত সমস্ত হয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছুটে চলেছে। মনে হচ্ছিল ওদের সবাই স্বাধীন, খোলা আকাশের নীচে মুক্ত হওয়াতে নিশ্বাস নিচ্ছে। কি মজা, নিজেদের খুশী মত যেখনে ইচ্ছা সেখানে যাবে। আর আমদের জন্য নির্দ্ধারিত এক বন্দী জীবন।
--
চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকালাম। সেদিনটা পূর্ণিমা কিনা জানা নেই, কিন্তু চাঁদ টাকে অনেক বড় আর উজ্জল দেখাচ্ছিল। তখন ই এক সাথীর গলায় শোনা গানের একটা কলি কানের কাছে বাজতে থাকল,"যে স্বপনে কমরেডস নয়ন ভরেছো, সে স্বপন মুক্তি স্বপন।" মনে মনে সেটাই আওড়াতে লাগলাম। ভ্যান আলিপুর প্রেসিডেন্সী জেলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
--
নাম ধরে ধরে সবাই কে গুনে গুনে জেল গেট দিয়ে ঢোকান হলো। মিনু কে আগের মত করে সকলে সাহায্যে নামিয়ে শীলা দি কোলে করে নিয়ে এলো। জেল অফিসে এক ঘন্টা অপেক্ষা করতে হলো। খাতা কলমে সবাই য়ের নাম, ধাম, কেস ইত্যাদি লেখা জোখা হলো। তারপর প্রত্যেক কে তন্ন তন্ন করে সার্চ করে, দুজন মহিলা ওয়াডার আর বড় বাঁশের পাকান লাঠিধারী একজন জমাদার, মানে ছেলে ওয়াডার গরুর পালের মত সব বন্দী কে তাড়িয়ে নিয়ে চলল। মিনু কে স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাওয়া হলো।
--
বিশাল পাঁচিল তোলা জেলের মধ্যে চলতে চলতে একটা অপেক্ষাকৃত ছোট পাঁচিল ঘেরা জায়গায় পোঁছে জমাদার সকলের পিলে চমকে বাঁজখাই গলায় হাঁক দিল,"জেনানা ফাটক আ গয়া।" বলেই দেয়ালের গায়ে ঝোলানো একটা দড়ি ধরে টান মারলো আর ঢং ঢং করে ঘন্টা বেজে উঠলো। ভিতর থেকে গেট খুলে এক জবরদস্ত জমাদারনি বেরিয়ে, গুনতি মিলিয়ে সবাইকে ওয়ার্ডের ভিতর ঢুকিয়ে গেট বন্ধ করে বিশাল তালা লাগিয়ে দিল।
--
মিনু কে হাসপাতালে রাখা হলো। বাকীদের আবার তল্লাশী করা হলো। শীলাদি কে অন্য ওয়ার্ডে নিয়ে গেল। আমাকে আর সাধারণ বন্দীদের সাথে হাজতী নম্বরে ওয়ার্ডে দেওয়া হলো। দেখলাম বড়জোর জনা পঞ্চাশেক মানুষ  থাকার একটা ঘরে কম করে শ দেড়েক বন্দিনীকে কেস নির্বিশেষে পুরে দেওয়া হয়েছে। একধারে আধা পাঁচিল তোলা, চট ঘেরা জায়গা প্রাকৃতিক কাজের জন্য নির্ধারিত। তার কটু গন্ধে গা গুলিয়ে বমি আসে।
 --
সেই রাতে জেনানা ফটকের সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা হয়ে গেল নিভা নাম এক ন.সি.এল ( নন ক্রিমিনাল লুনাটিক ) বন্দিনী আর একজন রাজনৌতিক বন্দিনীর সাহচর্যে। নিভা বলল," জানতো এখানে মোট পাঁচ টা ওয়ার্ড। হাসপাতাল, মেয়াদী নম্বর, হাজতী নম্বর, পাগল বাড়ী, ডিভিশন বাড়ী। তাছাড়া গোটা ছয়েক সেল।আর সারা দিনের খাবারের ফিরিস্তি টাও শুনে রাখো। সকাল একপিস পাউরুটি, বা একমুঠ চিড়ে, বা মুড়ি, বা ছোলা সেদ্ধ দেওয়া হয়, দুপুরে এক ডাব্বু ভাত, হলুদ জলের মত ডাল, বুড়িয়ে যাওয়া বা শুটকো তরকারির ঝোল।  রাতে তিনটি রুটির সাথে দুপুরের মত ই  ডাল, তরকারি। খাবারের পরিমান এতই কম জোয়ান মানুষ কেন বাচ্চাদেরও খিদে মেটে না।" রাত জেগে জেল আর জেলের বিভাগের জ্ঞান সঞ্চয়ের চেষ্টা করলাম।
--
ঘরের অধ্বেক জায়গা জুড়ে এক শ্রেনীর বিশেষ সুবিধা ভোগী বন্দিনী, যারা কতৃপক্ষের দালাল, তাদের দখলে। বাকীরা কোনমতে ঘাড় গুঁজে এক কাতে বসে ঘুমাতে চেষ্টা করছে। হাজতী নম্বরের পারিপার্শিক অবস্থা জেল ব্যবস্থার নগ্ন চেহারা টা চোখের সামনে মেলে ধরল। বুঝিয়ে দিল জেনানা ফটকে রীতি মত শোষন অত্যাচারের বিরুধ্বে লড়াই করেই সাধারণ মানুষরা কোনমতে টিকে আছে ।
*********************
(চলবে)

28 Feb 2022


জেনানা ফাটকের ইতিবৃত্ত - পর্ব ২

***********************
বোধহয় ভোরের দিকে চোখ লেগে এসেছিলো। হটাৎ বিকট এক বাজখাই গলায় চীৎকার," ফাইল, ফাইল।গুনতি, গুনতি।  ওঠ, ওঠ এই শালীরা।" তাকিয়ে দেখি মোঠা সোঠা লাঠি ধারী হেড জমাদারনি তার সাঙ্গপাঙ্গ,মানে  কিছু দালাল বন্দিনীদের সঙ্গে নিয়ে লক আপ খুলে ভেতরে ঢুকল। ঘরের বন্দিনীরা সবাই তাড়াহুড়া করে লাইন করে মাটিতে উবু হয়ে বসে গেল, নিভা আমার হাত ধরে টেনে একটা জাগায় বসে পড়ল। দালালরা কজন বন্দিনী আছে ,তাদের হিসাব নিল। নতুদের আলাদা করে নাম লিখে বলল," এই তোরা সকালের খাবার পাবিনা। ৯টার সময় কেস টেবিল হবে, তারপর দুপুর থেকে থেকে খাবার পাবি", বলে সদলবলে বেড়িয়ে গেল।
--
বন্দিনীরা প্রাতঃকর্ম সারা, স্নান করা আর খাবার জল ধরার জন্য হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দিল। কারণ দেরি হয়ে গেলে হয়ত সকালের খাবারটাই মিলবে না। নিভা তার খাবার নিয়ে এসে বলল," আমার থেকেই আজকে খা।" আমি অবাক হয়ে দেখলাম এক/ দেড় মুঠি ছোলা স্বেদ্ধ। ওতে নিভার ই পেঠ ভরবে না, আমি কি করে ভাগ বসাই। নির্বিকার চিত্তে নিভা বলল, "চিন্তা করিস না, তুই না নিলেও আমার পেটের এক কোনা ও ভরবে না। বলেছিনা এখানে পেটের আগুন কখন নেভেনা। জ্বলতে, জ্বলতে শেষে আর বোধ থাকে না।" জোর করে দেওয়া ছোলা মুখে তুলতে গিয়ে দেখি পোকা শুদ্ধ ছোলা। সেটা ফেলতে গেলে নিভা আমার হাত চেপে ধরল, "আরে করিস কি, পোকা ছোলা ফেলতে গেলে সব ফেলে দিতে হবে। চোখ বুঝে খেয়ে নে। দুদিনেই অভ্যেস হয়ে যাবে।"
--
খাওয়া শেষ না হতেই নিভা আমাকে হিড় হিড় করে টেনে নিয়ে চলল। "চল পাগল বাড়ীর দরজা খোলা, আমি ওখানে আগে থাকতাম। এইফাঁকে দেখেনে, হয়তো আর কোনোদিন দেখার সুযোগ পাবিনা।" জেলখানায় পাগলরা থাকে আগে জানা ছিল না। পরে শুনেছিলাম অনেকেই, বিশেষত যাদের আর্থিক সঙ্গতি নেই, তারা জেলখানায় মাথার গন্ডগোল হলে নিজেদের আত্মীয় স্বজন দের জেলে সেরে ওঠার জন্য দিয়ে যায়। যেমন নিভাকে দিয়ে গেছিল। তাছাড়া রাস্তা থেকেও পাগল দের ধরে এনে এখানে রাখা হয়। এরা সবাই নন ক্রিমিনাল লুনাটিক কেসে বন্দী।
 --
পাগল বাড়ী ঢুকে আমি পাথরের মত নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। গোটা তিনেক খাঁচার মত ঘর। সেখানে অনেক অনেক, একেবারে উলঙ্গ কঙ্কাল, মাথায় চুল জট পাকিয়ে গেছে। গা হাত পা নোংরায় কালো। এখানে সেখানে দগদগে ঘা।  অনেককেই হ্যান্ড কাফ দিয়ে, বা শেকল দিয়ে গরাদের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। যে যেখানে পেরেছে প্রকৃতির ডাকে কাজ সেরেছে। তারই পাশ থেকে খাবার খুঁটে খাচ্ছে। অনেকে আবার নিজেদের মধ্যে মারামারি, চুল টানাটানি, এমন কামড়া কামড়ি করে পরস্পরকে ক্ষত বিক্ষত করছে, রক্ত ঝরছে। কেউ গলা ফাটিয়ে কাঁদছে কেউ গালি গালাজ করছে।কাউকে মানুষ বলে চেনা যাচ্ছেনা। সাধারণ মানুষ ওখানে কদিন থাকলে পাগল হয়ে যাবে।
--
নিভা আমার হাত ধরে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে আসার পর সম্বিত ফিরে পেলাম। একটা জায়গায় আমাকে বসিয়ে জল খাওয়াল। একটু ধাতস্থ হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ওরা এ রকম কঙ্কালের মত কেন !" "কেন আবার ঠিক মত খাবার দেয় না। জানিস ডাক্তার বাবুরা ওদের জন্য কত বেশী বেশী ডায়েট লিখে দেয়, দুধ ,ফল বিস্কুট,পাউরুটি, মাছ সব। কিন্তু কিছুই ওরা পায় না। দালাল গুলি সব মারে। আমাদের সকলের খাবার থেকেও ওরা মারে। তাইতো এতো কম খাবার পাই আমরা।" "কিন্তু মেট্রন,ওয়ার্ডার রা কিছু বলে না !" "পাগল ওদের নির্দেশেই তো এসব চলে। ওরাই তো মোটা ভাগ পায়। দালাল রাও পেটমোটা হচ্ছে খেয়ে খেয়ে। আবার নিজেদের পছন্দের জিনিস আনাছে ওয়ার্ডারদের দিয়ে। সপ্তাহে একদিন মাছ আর একদিন মাংস দেবার দিন। সেদিন দেখবি মগ ডুবিয়ে মাংস খেয়ে ঢকঢক করে হজমের ওষুধ খাচ্ছে।"
--
ইতিমিধ্যে 'কেস টেবিল, কেস টেবিল' করে বিকট চিৎকার শোনা গেল। নিভা আমাকে নিয়ে গিয়ে কেস টেবিলের যাবার জন্য লাইনে দাঁড় করিয়ে দিল। আমাদের নতুন বন্দিনীদের দুইজন মেয়ে ওয়ার্ডডার আর একজন লাঠিধারী ছেলে ওয়ার্ডারের সাথে জেনানা ফাটক থেকে বেরিয়ে ছেলেদের ওয়ার্ডের মধ্যে একটা ফাঁকা জায়গায় দাঁড় করিয়ে দেওয়া হলো।সেখানে একটা টেবিলে একজন ডেপুটি জেলার, হেডজমাদার বসে একটা বিরাট জাবদা খাতায় নাম,ধাম ঠিকানা,  কেস ইত্যাদি লিখে নিচ্ছে। প্রায় ঘণ্টা দুয়েক পর ওয়ার্ডে ফিরলাম। আমাকে ডিভিশন ওয়ার্ডে রাখা হল। প্ররথমেই এই এই ওয়ার্ডডের  নামকরণের বিষয়ে একটা কথা পরিিিষ্কার করা দরকার। ইংরাজ রাজত্বে এখানে রাজবন্দিনীদের রাখা হত। তাঁরা ছিলেন মধ্য উচ্চবিত্ত পরিবারের মানুষ এবং বিশেষ সুযোগ সুবিধা প্রাপ্ত। কালক্রমে এখানে শুধু রাজনৈতিক বন্দিনীদের রাখা হত। আমাদের সময় শুধু নকশাল বন্দিনীদের রাখা হত, বিশেষ সুযোগসুবিধা বর্জন করলেও। প্রথম ছিল ক্লাস ডিভিশন , পরবর্তি কালে রাজনৈতিক মতাদর্শের ডিভিশন, যাতে আমজনতার মধ্যে সেই মতাদর্শ ছড়িয়ে না পরে।     
---
আমি  যেদিন ডিভিশন ওয়ার্ডে যাই তখন সেখানে  আর দোতলার সেলে শুধু নকশাল বন্দিনীদের বন্দীদের আলাদা করে রাখা হয় যাতে তারা সাধারণ বন্দীদের সাথে মিশতে না পারে। শীলাদি ছাড়াও মুক্তি, বিজু আরও পাঁচজনের সাথে পরিচয় হল। ওপরে সেলে কল্পনা, ডালিয়া আর জয়া থাকতো। বিজু ছিল সবার ছোট, মুক্তি, ডালিয়া আমার সমবয়সী, কল্পনা আর জয়া (মিত্র) ছিল শীলাদির বয়সী। ১টা র সময় হেড ওয়ার্ডার তথা জমাদারনী এসে লক আপ করে দিল। 
--
ভাত খাবার পর বিজু পড়ল আমাকে নিয়ে। শুনলাম প্রতি সপ্তাহে এক মুটকি কেরোসিন তেলের গন্ধ ভরা মাথার তেল, এক মুটকি সরষের তেল আর একটুকরা কাপড় কাচার সাবান বন্দিনীদের প্রাপ্য। সেই কেরোসিন তেল ওরফে মাথার তেল বিজু আমার মাথায় জবজবে করে মাখিয়ে, কোষে বেঁধে বেশ কিছুক্ষণ ৱেখে দিল। তারপর একটা সরু চিরুনি দিয়ে জোরে জোরে আঁচড়াতে লাগলো। আর কেরোসিনের গন্ধে ঝরঝর করে উকুন পড়তে লাগল, মুক্তি সেগুলিকে মারতে থাকল। বিকালে ৪টের লকআপ খুললে বিজু কাপড় কাচার সাবান মাথায় গায়ে ঘষে স্নান করিয়ে দিল।প্রায় দিন ২/৩ দিন এই পর্ব চলল, পুলিশ থানার কম্বলে সঞ্চিত উকুন তাড়াবার জন্য। বিকাল ৫/৬ টার সময় আবার লক আপ হলে মুক্তি আর বিজু মিলে পুলিশ লক আপে মার খেয়ে আঘাতের জায়গায় সরষের তেল মালিশ করতে থাকে।যারাই নতুন আসে এইভাবে শুশ্রুষা করে সারিয়ে তোলাটা এখানকার রেওয়াজ। সাথীদের সাহচর্য্যে আর সেবায় শরীর মন দু ই শান্তি আর স্থিরতা লাভ করে। সন্ধ্যে বেলায় খাবার খেয়ে গল্প করা বা বই পড়া হত, প্রায়ই গানও  হত। মুক্তির গলায় অসাধারণ কাজ ছিল। বিজুর মিস্টি গলা ছিল। সবার শেষে  ইন্টারন্যাশনাল গাওয়া হত। এইভাবে শুরু হল আমার জেল জীবন।
**********************
(চলবে )
















8 Sept 2016

ছোট্টবেলা

ছোটবেলা
*******

হারিয়ে গেছে আমার সেই ছোট্টবেলা
সাথিরা মিলে তেঁতুল খাওয়া
খোলা মাঠে খোখো আর কাবাডি খেলা
ঝড়ের মাঝে আম কুড়ান, বৃস্টি ভেজা
কোমর জলে ডুবকি দেওয়া
হারিয়ে যাওয়া আমার ছোট্টবেলা।
--
হারিয়ে গেছে আমার সেই ছোট্টবেলা
লোড শেডিং এর দিনে পাঠে ফাঁকি
ভাড়াটে বাড়ীর ছাদে আসর জমাটি
সবাই মিলে তারা চেনা আর গোনার খেলা
ঠাকুমার মুখে গল্প, কাকীমার হাতে মুড়ি মাখা
হারিয়ে যাওয়া আমার ছোট্টবেলা।
--
হারিয়ে গেছে আমার সেই ছোট্ট বেলা
ক্লাসে বই মুখে চুপি চুপি গল্প
দিদিমনিদের স্বস্নেহে বকুনি
স্কুলের সবুজ মাঠে কত খেলা
চড়ুই ভাতির কত মজা,খাওয়া দাওয়া
হারিয়ে যাওয়া আমার ছোট্টবেলা।
--
হারিয়ে গেছে আমার সেই ছোট্ট বেলা
গঙ্গার জলে পশ্চিম আকাশ রাঙিয়ে সূর্য ডোবা
রাতের বেলা গায়ে জোৎস্নার গন্ধ মাখা
মাঠের পরে কাশবনে বাতাসের লুটোপুটি খেলা
ভাদ্রের মেঘে শরতের আগমনীর আনন্দ বার্তা
হারিয়ে যাওয়া আমার ছোট্ট বেলা।
-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

সততা





সততা 
 *****
দুই সন্তানের মা, নমিতা থাকত দত্তাবাদ বস্তির এক চিলতে ঘরে। স্বামী একটা ছোটখাটো কারখানায় কাজ করত। নমিতা বাড়ী বাড়ী বাসন মাজা, ঘর পরিষ্কার, কাপড় কাঁচা ইত্যাদি কাজ করত। এক চিলতে দরমার ঘর, চার ধারে বাঁশের খুঁটি, মাথায় বাঁশের উপর চাটাই, প্লাস্টিক। তার ভাড়া ২০০ টাকা। রাস্তার আলো থেকে হুক করে বিজলীর দুটি পয়েন্টের জন্য ৫০টাকা। ঘর ও সরকারি জমির উপর জবর দখল করে বানানো বিশাল বস্তির মধ্যে। বস্তির মালিকানা গুটি কতক লোকের হাতে। তারা যে পার্টি সরকারে থাকে তাদের দলের লোক। সরকার বদল মানে দল বদল।
--
তাই ইচ্ছা মত ভাড়াটে দের ওপর অত্যাচার চালাতে বাধা নেই। বৃষ্টির সময় ছাদ থেকে ঘরে জল পরে, তলা দিয়ে জল ঢোকে। ঝড়ে চাল উড়ে গেলে নিজেদের সারাতে হয়। দুটি বড় বড় পুকুর সরকারি জমির ওপর। তাতেই বস্তিবাসীদের  সব কাজ চালাতে নির্দ্দেশ দেওয়া আছে। বাকি কাজের জন্য খালি মাঠে যেতে হয়। ফলে সর্দিকাশি, পেটখারাপ তাঁদের নিত্য সঙ্গী। বাড়ীর মালিকদের ঠিক সময় মত ভাড়া আদায় করা ছাড়া কোন দায় নেই।
--
মালিক দের ক্রমাগত বাড়ীর পরিসীমা বাড়তে থাকে, পাকাপোক্ত ইট সিমেন্ট টাইলস লাগান ঝাঁ চক চক বাড়ী তৈরী হয়। সরকারি খরচে বস্তি উন্নয়ন প্রকল্পের সুযোগ সুবিধা আদ্ধেকের বেশী মালিক দের সেবায় যায়। বাকী টুকু তে ২০০ঘর ভাড়াটের জন্য দুটি মাত্র জলের কল আর দুটি টয়লেট তৈরী হয়। বস্তিবাসীদের সকল কেই সকালে কাজে বার হতে হয়, অতএব জল, কল আর টয়লেট নিয়ে নিত্য ই ঝগড়া বিবাদ লাগা থাকে।
--
অথচ প্রতি দুবছর অন্তর ঘর সারানোর নামে মালিক রা ভাড়াটেদের কাছ থেকে টাকা তোলে। ঘর সারানো পর দেখা যায় প্রত্যেকের ঘর আগের থেকে ছোট হয়ে গেছে, তা হয় মালিকের এলাকায় ঢুকে গেছে নয় নতুন দু / চারটি ঘর তৈরী হয়েছে নতুন ভাড়াটে বসানোর জন্য।  আর একটা সময় বস্তি মালিকরা খুব সক্রিয়। ভোটের সময় নিজেদের ভাড়াটেদের জোগাড় করে তাদের পছন্দসই প্রার্থীদের জন্য মিছিল করানো, ভোট দেওয়ান ইত্যাদি।
--
বাড়ী ওয়ালাদের আর একটি রোজগারের ব্যবস্থা হল মদের ঠেক চালান। পয়সার আমদানি দেদার , তার থেকে নিত্য নতুন ব্যবসা খোলা। শুধু রাজনৈতিক পার্টিদের চাঁদার জোগান ঠিক রাখা আর গদি নিয়ে কামড়া কামড়ির সময় মদত দেওয়া। মাঝে মধ্যে পার্টির মস্তানদের মধ্যে লড়াই চলে, বোমাবাজী হয়। তখন নমিতরা ছেলে পুলে নিয়ে দুরু দুরু বুকে সারা রাত উৎকণ্ঠায় কাঁটায়। তাঁদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা চলে।
--
এক শীতের সকালে নমিতা যখন প্রথম মঞ্জরীর বাড়ী কাজে আসে, পাতলা ছেঁড়া কাপড়ের আঁচল গায়ে দিয়ে হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে। মঞ্জরী কি কি করতে হবে বলে দিয়ে সরোদ বাজাতে বসে যায়। রান্না আগেই হয়ে গেছিল। দুই ঘন্টা বাদে যখন হুঁশ আসে, "আরে মেয়েটা এতক্ষন কি করছে, অন্যেরা তো এক ঘন্টার আগেই কাজ সেরে চলে যেত। উঠে গিয়ে দেখে সারা বাড়ী ঘর ঝক ঝক করছে, ওয়াশিং মেশিনে কাঁচা কাপড় মেলা হয়ে গেছে। রান্নাঘরের সব তাক টাক পরিষ্কার করে বাসন মাঝতে বসেছে। অবাক চোখে তাকিয়ে কিছুক্ষণ থেকে, বলে " কাজ হয়ে গেলে টেবিলের ওপর তোমার খাবার ঢাকা আছে খেয়ে নিয়ো।"
 --
দুদিন পর মঞ্জরী ওকে দুটো কাপড় দেয়, নমিতার চোখ দুটি সজল হয়ে ওঠে। " তোমার গায়ের চাদর নেই।" "একটা চাদর আছে, সেটা আমার বর গায়ে দিয়ে কারখানায় গেছে, ফিরতে রাত হয়ত, ঠান্ডা লাগবে তাই।" মঞ্জরী একটা গায়ের চাদর ও বার করে দেয় ," মনে মনে ভাবে, যা ঠান্ডা পড়েছে, শেষে অসুখে পরে গেলে আমার ই মরণ।"
 --
দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। নমিতার কাজে কোন ফাঁকি নেই। সময় সময় মঞ্জরী বকে, "হ্যারে তোর বাড়ীঘর নেই, বাচ্চাদুটো স্কুল থেকে আসবে ! কখন বাড়ীর রান্না করবি আর ওদের খেতে দিবি?" "আরে মামী তুমি এত ভেবোনা। আমি ঠিক সময়ে বাড়ীর কাজ সেরে ফেলব। তুমি যে বড় ড্রাম টা দিয়েছ, তাতে সকাল বেলায় জল ভরে রেখে আসি, ফিরে গিয়ে কাজ করতে কোন অসুবিধা হয় না, আর রান্না মানে তো ডাল ভাত বা ভাতে ভাত দুটো ফুটিয়ে নেওয়া।"" "যাই হোক তাড়াতাড়ি বাড়ী যা। আর ঘরের চাবিটা নিয়ে যা, বিকালে আমি থাকব না।" মঞ্জরীর ফ্ল্যাটের একটা চাবির সেট নমিতার কাছেই থাকে, মাঝে মধ্যে ভুলে রেখে যায়।
--
ইতিমধ্যে তাদের মধ্যে একটা পারস্পরিক আস্থার জায়গা তৈরী হয়ে গেছে। নমির কখন কোন কাজে ফাঁকী নেই, মনে হয় যেন নিজের ঘরের কাজ করছে। হাজার অভাব স্বত্তেও মুখ ফুটে কখন কিছু চায়না। মঞ্জরীর বাড়ীতে সব কিছু খোলা মেলা পরে থাকে, আলমারিতে চাবি ঝুলতে থাকে। সর্বত্র নমির অবাধ গতি। টেবিলে টাকা পয়সা, মানিব্যাগ পড়ে  থাকে। নমি সুন্দর করে টেবিল পরিস্কার করে রাখে। পাঁচ বছরে একটা সুতোও এদিক ওদিক হয়নি।
--
মঞ্জরী একটু বেখেয়ালি। কোনদিন ব্যাগে ভরতে গিয়ে হাজার টাকার নোট মেঝেতে পড়ে গেছে খেয়াল করেনি, কোনোদিন আবার আলমারি হা করে খোলা রেখে বেড়িয়ে যায়। ফিরে এসে নমির কাছে বকা খায়,"মামী তোমাকে নিয়ে আর পারা যায় না। এক একদিন এক একটা কীর্তি করে রেখে যাও।""যাক তুই আছিস তো, সব ঠিক করে রাখবি জানি তো, আর বকিস না।"
--
১৯/২০ বছরের মেয়ে। অবিরাম দারিদ্রের সাথে লড়াই করে চলেছে। কিন্তু প্রখর আত্মসম্মান বোধ। মাঝে মাঝে টাকা ধার করে, ঠিক শোধ ও করে দেয়। মুখ ফুটে কখন কিছু চায় না। বাড়তি কিছু দিলে শুধু একবার চোখ দুটি তুলে তাকায়। একবার ধূম জ্বর নিয়ে নমি কাজে এল। ওর চেহারা দেখে মঞ্জরী কপালে হাত দিয়ে দেখে বলে, "যা বাড়ী যা, গায়ে তো খুব জ্বর, এত ঠান্ডা লাগালি কি করে ?" "শুধু আমার নয় বাড়ী শুদ্ধ লোকের ঠান্ডায় জ্বর হয়েছে। আসলে মাটিতে মাদুর পেতে শুই তো, গায়ে দেবার দেবার মতো মোটা কিছু নেই।"
--
" ঠিক আছে বাড়ী গিয়ে তোর ভাইকে রিকশা টা নিয়ে আসতে বল।" একটু পরে নমির ভাই রিকশা নিয়ে এল, ছোট বোনকে সঙ্গে নিয়ে," দিদি বলেছে, যে কদিন আসতে পারবে না, বোন কদিন তোমার কাজ করে দেবে। তোমাকে তো কাজে যেতে হবে।" নমির বিবেচনা বোধে বিস্মিত মঞ্জরীর মন কৃতজ্ঞতায় ভরে গেল। কথা না বাড়িয়ে বাড়তি তোশক, কম্বল, জ্বরের ওষুধ আর টাকা পাঠিয়ে দিল। তার সাথে নিজেদের আধ পুরান কিছু গরম জামা কাপড় ও দিয়ে দিল।
 --
কদিন বাদে নমি কাজে এসে প্রথমেই বলল, "মামী, তোমার পাঠান জিনিষ গুলো খুব কাজে লেগেছে। তবে আমাকে যে টাকা পাঠিয়ে ছিলে আর বোনকে যা দিয়েছো, আমার মাইনে থেকে কিছু কিছু করে কেটে নিও।" লজ্জ্বায় মঞ্জরীর মাথা হেঁট হয়ে যায়। তার বাড়ীতে  বাড়তি তোষক কম্বল থাকা স্বত্তেও নমির পরিবার এই প্রবল শীতে ঠান্ডা মাটিতে রাত কাটছিল, সে খোঁজ ই রাখেনি। অথচ ওই টুকু মেয়ের কি অপরিসীম বিবেচনা বোধ। "যা তোকে আর পাকামো করতে হবে না", বলে কোন মতে ইতি টেনে পালিয়ে বাঁচে।
 --
 একবার মঞ্জরীরা দার্জিলিং যাচ্ছে শুনে, লজ্জিত মুখে এসে বলল,"মামী আমার ছেলে, মেয়ে, আর বরের জন্য ওখান থেকে সোয়েটার এনে দেবে ? মাইনে থেকে আস্তে আস্তে টাকা শোধ করে দেব।" "তোর লাগবে না?" "হ্যা মানে, আমার ও একটা কালো সোয়েটারের খুব শখ, কিন্তু তোমার ওপর অনেক চাপ পড়ে যাবে যে।" " সে সব তোকে ভাবতে হবেনা। আমার সাধ্য মত আমি এনে দেব। পয়সার চিন্তা তোকে করতে হবেনা। তুই আমার জন্য যা করিস, নিজের লোকের থেকেও বেশী।"
--
ফিরে আসার পর সোয়েটার গুলি পেয়ে খুশিতে নমির শ্যামলা রঙ টা কচি কলাপাতার মত ঝল মল করতে থাকে। মঞ্জরী মনে মনে ভাবতে থাকে, " সত্যি মেহনতি মানুষ রা কত অল্পেতে খুশি হয়। আর আমাদের চাওয়ার পাওয়ার যেন কোন শেষ নেই।
--
কিন্তু এরপর মঞ্জরী আর নমির ছাড়া ছাড়ির দিন এগিয়ে এলো। মঞ্জরীর স্বামীর সরকারি চাকরি। অবসরের তিন মাসের মধ্যে সরকারি আবাসন ছেড়ে দিতে হয়। যাবার দিন এগিয়ে আসতে থাকে।  নমি মামীর  গলা জড়িয়ে শুধু কাঁদতে থাকে, মঞ্জরীও কান্না গিলতে থাকে, এমন পরিজন দুর্লভ। এদিকে গোছগাছ শুরু হয়ে যায়। মঞ্জরী কিছু কিছু ফার্নিচার, বাসনপত্র, ট্রাংক,ব্যাগ ইত্যাদি নমিকে দিয়ে দেয়। নমির ভাই আর বর এসে নিয়ে যেতে থাকে।
--
ওপরের লফ্ট এ টিভি, ফ্রিজ ইত্যাদির প্রচুর পিসবোর্ডের কাটিম জমেছিল। সেগুলি নমিকে নিতে দেখে মঞ্জরী জিজ্ঞাস করে এগুলি দিয়ে জঞ্জাল বাড়িয়ে ঘর গুদাম করে ফেলিস না, উনানে আঁচ দিয়ে দিস।"
"নমি হেসে বলে," না মামী গুদাম হবেনা। তোমার দেওয়া জিনিস ছাড়া আমার ঘরে তো আর কিছু ছিল না। শুধু দুটো মাদুর আর দুচারটে জামা কাপড়। " মঞ্জরী স্তম্ভিত হয়ে যায়। শ্রদ্ধায় মাথা নীচু করে ভাবে, "একেবারে নিঃস্ব এই মেয়েটা কত কষ্ট সহ্য করেছে। কিন্তু মুখ ফুটে কখন দয়া ভিক্ষা করেনি। হাতে তুলে না দিলে, সুযোগ থাকা স্বত্বেও একটা কুটি ও সরায় নি।    এ আত্মমর্যাদা বোধ আর সততা - এই বোধহয় মেহনতী মানুষের একমাত্র সম্বল আর অনন্য সম্পদ।"
---------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------


















31 Aug 2016

মচকায় না

মচকায় না
*******
উপছে  পড়া ভীড় ঠেলে অভিমন্যু  লোকাল ট্রেনের বগি থেকে কোনোমতে বিরাটী স্টেশনে পা রাখাল। কামরায় ওঠা আর নামা যাত্রীদের মধ্যে প্রায় যুদ্ধ বেঁধে গেছে। তার ভিতর থেকে সশরীরে বেরিয়ে  আসা ও কম ঝক্কি নয়। একটু ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে গিয়েই প্রবল ধাক্কায় তা যেন আবার বুকের ভিতর ঢুকে গেল। চারপাশে তাকিয়ে বুঝতে পারল প্লেনড্রেস পুলিশ থিক থিক করছে  স্টেশনে।
--
১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বর মাস। অঘোষিত ভাবে নিষিদ্ধ একটি রাজনৈতিক দলের কর্মী সমর্থক হওয়া মানেই অপরাধ। আর একটু বিশিষ্ট কর্মী হলেই তাঁদের মাথার দাম ধরা থাকত অথবা দেখা মাত্রই গুলি করার নির্দেশ। অভিমন্যু অল্প বিস্তর তাদের দলে। খুব নিরীহ মুখে শান্ত ভঙ্গীতে একটি কামরা আবার উঠতে গেল। ট্রেন তখন চলতে শুরু করে দিয়েছে। তার সাথে সাথে ডজন ডজন মানুষ প্রতিটি কামরার সাথে দৌড়চ্ছে।
--
ট্রেনে ওঠা অসম্ভব বুঝতে পেরে একটা দোকান থেকে সিগারেট কিনে স্বাভাবিক ভঙ্গীতে ধরাল। আড় চোখে তাকিয়ে দু / তিন পা বাড়াতেই একজন পিছন থেকে কাঁধে হাত রেখে বলল ," আরে আরে অভিমন্যু বাবু কোথায় যাচ্ছেন! আমরা যে এতজন লোক ৫/৬ ঘন্টা ধরে অধীর আগ্রহে আপনার জন্য অপেক্ষা করছি, আপনাকে সাদরে আমাদের সদর দপ্তরে নিয়ে যাবার জন্য।একটুর জন্য ফসকে যাননি সেইটাই মহাভাগ্য," এক জাদরেল পুলিশ অফিসার তরুণ সেন পেছন থেকে তার পিঠে পিস্তল ঠেকিয়ে, কানের কাছে মুখ নিয়ে কথাগুলি বললো।
--
অভিমন্যু এক হাতে সিগারেটটা টানতে থাকে, আর অন্য হাতে তাঁর রাতের সেল্টারের একটা চাবি ছিল, সকলের অগোচরে কায়দা করে একফাঁকে বার করে ফেলে দেয়। ইতিমধ্যে প্রায় ৫০/৬০ জন সাধারণ পোশাকের সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী তাকে ঘিরে  ফেলেছে। "অনেকবার চোখে ধূলো দিয়ে পালিয়েছেন। এবার আর উপায় নেই। যার সাথে দেখা করতে এসেছেন সে যে অলরেডি আমাদের জালে, তাতো জানেন না। তার কাছে খবর পেয়ে আমরা ভোর রাত থেকে চক্রব্যূহ সাজিয়ে আপনার অপেক্ষায় আছি। সেটা টের পেলেও ভীড় ঠেলে ট্রেনে উঠে পালাতে পারেননি। এবার চলুন আমরা একটু খাতির দারি করি।"  অভিমন্যু শার্টের হাতার ভাঁজে রাখা একটা ছোট্ট চিরকূট অনেক ক্ষন ধরে ফেলে দেবার চেষ্টায় ছিল। আর এক দুঁদে অফিসার দেখতে পেয়ে খপ করে সেটা ছিনিয়ে নিল।  
--
পুরো বাহিনী ঘিরে ধরে স্টেশানের বাইরে রাখা গাড়ীতে তুলল। আগে পিছে পুলিশ ভ্যান দিয়ে ভি আই পি সম্মানে কলকাতার এক বিশেষ থানায় তুললো। শুরু হল থার্ড ডিগ্রি অত্যাচার। হাত পা বেঁধে মাথা পাখার সাথে ঝুলিয়ে দিল। মাথাটা নীচের দিকে ঝুলতে থাকে।হাতে,গায়ে, পায়ের তলায় বেধড়ক লাঠির বাড়ি পড়তে লাগল। কত বার জ্ঞান হারালো। জলের ঝাঁপটা দিয়ে জ্ঞান ফিরিয়ে এনে নতুন বাহিনী আসে, মারতে থাকে, নতুন করে জ্ঞান হারানো পর্যন্ত। সঙ্গে অশ্রাব্য গালি গালাজ আর অজস্র জিজ্ঞাসা, মুখ খোলানোর চেস্টা। উত্তর না পেয়ে আবার মার। এইভাবে কতক্ষন যে পার হয়ে গেল সে জানতেই পারলনা।
--
নরম গরমে চলার নীতি। তাই হটাৎ নামিয়ে জল টল খাইয়ে একটু সুস্থ করে মিস্টি কথায় মুখ খোলানোর চেষ্টা, অভিমন্যু মুখে শুধু আলগা একটা তাচ্ছিল্যের হাসি। "ঠিক আছে, শুধু এই চিরকুটে যে এপয়েনমেন্ট গুলি সংকেতে লিখেছিস, সেগুলি বল। তোকে ধরার পর থেকে এই সাঙ্কেতিক চিহ্ন গুলি আমরা পাঠোদ্ধার করে যা বুঝছি গোটা কয়েক এপয়েনমেন্টের ডেট, টাইম আর স্পট, যেগুলির সময় একটা ছাড়া বাকি গুলি অলরেডি পার হয়ে গেছে। যেমন বি / স / স ১০ মানে বিরাটি /সোমবার / সকাল ১০ টা, ইত্যাদি, ইত্যাদি । অনেক ঘোল খাইয়েছিস বাপ্ এই তিন বছর ধরে। হাতে পেয়েও কয় ব্যাটা ফসকে গেল তোর জন্য। এইটা শুধু বল বু / চ / ৱ ৫, মানে আজ বিকাল ৫টা। শুধু চ মানে কি,স্পট টা বলে দে।" মনে মনে কিছু হিসাব নিকাশ করে নিল অভিমন্যু, একটু সময় কেনা যাক। এর মধ্যে তার ধরা পড়ার খবর সব খানে রটে গেছে। বাড়িতে ও খবর চলে গেছে নিশ্চয়। হয়ত মা তার সাথী আর বন্ধুদের সাহায্যে থানাগুলি চষে  ফেলছে। আর কিছুটা বিশ্রাম পেলে আবার অত্যাচার সহ্য করার শক্তিও সঞ্চয় হয়ে যাবে। চালাকি ধরা পড়ার পর অত্যাচারের মাত্রা বাড়বে। তবে ভাঙতে তাকে পারবেনা, কিছুতেই না।" " কিরে বল চ মানে কি ?" মিঃ সেন প্রশ্ন করে। " চ মানে চার নম্বর ব্রীজ বাসস্টপ।" "সত্যি বলছিস তো !" - সেন একটু সন্দিগ্ধ্। যেন আহত সুরে উত্তর আসে "যা মনে হয়।" "ঠিক আছে চল তবে।" সহকর্মীদের প্রতি অর্ডার, "গেট রেডি & হ্যারি  আপ।
--
সশস্ত্র প্লেন ক্লোদস ফোর্স আর অভিমন্যু কে নিয়ে মিঃ সেন রওনা দেন। কানে কানে এক সহকর্মী বলেন," তুমি যেন ঠিক বিশ্বাস করতে পারছনা।" "হুম।" বেলা একটা থেকে ছটা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও কারোর টিকির দেখা পেল না পুলিশ । ইতিমধ্যে সবাই স্পেশাল এগ / চিকেন রোল আর চা খেয়েছে। অভিমন্যু হাতে রোল আর চা দেবার সময়ে সেন বলেছে, "বুঝতে পারছি গিয়ে আবার ঝোলাতে হবে, তা খেয়ে গায়ে একটু বল সঞ্চয় করে নিতেই তো আমাদের তুই এখানে নিয়ে এসেছিস, তাইতো। ভড়কি দেবার ফল টা জেনেই ঠান্ডা মাথায় খেলা টা খেলেছিস।" হটাৎ একটা ফোন আসার পর, সেন সকল কে বলে," সবাই থানায় ফেরা যাক। এ ব্যাটার দেখা করার স্পট টা ছিল চেতলা বাসস্টপ। চ মানে চার নম্বর নয়, চেতলা। আমার আগেই সন্দেহ ছিল। সাংঘাতিক ছেলে বটে।"
--
থানায় ফিরে অভিমন্যু কে যথারীতি চার হাত /পা বেঁধে ঝুলিয়ে পালা করে বীর পুঙ্গবেরা মারতে শুরু করল। অন্য দিকে যাদের জন্য সে চেতলার জায়গায় চার নম্বর বাসস্টপে পুলিশ বাহিনী কে নিয়ে গেছিল, তাদের একজন নাকি আগেই ধরা পড়ে সব বলে দিয়েছিল। অন্য জন এখন সমাদরে পুলিশের অতিথি হয়ে এ থেকে জেড পর্যন্ত্য বলতে শুরু করেছে।
তবে এরা নেতা হলেও, এদের ধরিয়ে দেওয়া ব্যাপক সাধারন ক্যাডার আর সমর্থক রা কিন্তু অভিমন্যুর পথ নিল। তাই দেখে ওর সমস্ত যন্ত্রনা তুচ্ছ মনে হল, শ্রদ্ধ্বায় / গর্বে বুক ভরে গেল তার।
--
একদিন মিঃ সেন অনেকক্ষন  অভিমন্যুর সাথে তাদের কাজ কর্ম নিয়ে অনেক প্রশ্ন করল। দেশ বিদেশ নিয়ে অনেক আলোচনা হল । শেষে প্রশ্ন করল,"তোদের  উদ্দেশ্য কি সফল হবে কোনোদিন!" অভিমন্যু দ্বিধাহীন গলায় বলে," জীবনের সব কিছুকেই তো  উত্থান পতনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। কাজ করলে ই ভুল হয়, বেনো জল ঢুকে পড়ে । সে সব বাধা কাটিয়ে আবার নতুন উদ্যমে এগোতে হয়, একদিন না একদিন তা সফল হবেই। "
--
তিন সপ্তাহ বাদে বর্বর অত্যাচারে শারীরিক ভাবে ভেঙে চুরে দ হয়ে যাওয়া অভিমন্যু আর অন্যান্য সাথীদের কোর্টে নেবার অর্ডার হল। ভ্যানে ওঠানোর আগে বুট জুতো পরা  অবস্থায় তার পায়ের উপর দাঁড়িয়ে সেন  বলল,"এবার আমার গলাটা ধরে দাঁড়াবার চেষ্টা কর।" কিছুক্ষন চেষ্টার পর অভিমন্যু কোনমতে দাঁড়াল, কিন্ত হাত গুলি মুচড়ে গোল হয়ে গেছে। তাই সকলে ধরে তাকে ভ্যানে তুলে দিল। শুধু বেইমান দুটি পুলিশ কে দ্বিধা দ্বন্দ্ব হীন ভাবে সাহায্য করার পুরস্কার স্বরূপ ছাড়া পেয়ে গেল।
--
মিঃ সেন কে অভিমন্যুর দিকে বিশেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে  থাকতে দেখে  তার এক  অধস্তন জিজ্ঞাসা করে,"স্যার, আপনার ওনার প্রতি কেমন যেন একটা বিশেষ শ্রদ্ধা আছে, তাই না?" "ব্যাটা, দেখতে রোগা পটকা, কিন্তু একেবারে আদত বাঘের বাচ্চা। জানো, এ ছেলেটার খোঁজে আমরা যখন সারা ফুলবাগান চত্বর/ বেলেঘাটা গরু খোঁজা খুঁজছি, ও নাকি তখন বিভিন্ন থানার সামনে ফুটপাতে ঠ্যালাওয়ালা দের সাথে চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমাত। নাকানি চোবানি খাইয়ে ছেড়েছে। শুনবে কোনদিন জেল থেকে পালিয়েছে। দেখলে তো, এত অত্যাচারেও একটু ও মচকালো না।"
--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------





























--
















6 Jul 2016

উৎসব

উত্সব
*****
পর্ব -১

শহরের এক নামী রাস্তা,
পথের ধারে চোখে পড়ে
বাঁশ, কঞ্চি আর গাছের 
বাকল দিয়ে রথ বানাচ্ছে
কসর আর গণেশরা। 

--
কি অপরূপ কারুকাজ
দিনে রাতে কাজ চলে,
কয়েক দন্ড থ হয়ে 
দাঁড়িয়ে দেখতে হয়
চোখ ফেরানো যায়না।
--
কয়েক ডজন শিশুও ব্যস্ত
বাপেদের হাতে হাতে কাজ
এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য,
কচি কচি নিপুন হাতগুলি
যেন সৃষ্টি রসে বিভোর।
--
বেশ কদিন ঘরে ঘরে
ঘাম ঝরে, ঝরে কচি রক্ত 
দিন রাত, রাত দিন, কাজ শেষ  
রথের ঠিক আগে আসে দাদনদার
কড়ির সুদ আসল বুঝে নিতে।
--
ভাসা ভাসা কচি চোখগুলি
চেয়ে থাকে নির্বাক, নিস্পলক
মনের কোনে ছোট্ট একটু আশা 
যদি একটা রথও রেখে যায়
সবাই মিলে টানবে সেখানা।
--
দাদনদারের ভারি ঠেলা
আকাশ কুসুম চায় হতভাগারা, 
কত কত দামে বিকোবে বাজারে !
খোকাবাবুরা টানবে সে রথ
বাপেদের পকেটের জোরে।
--------------------------

পর্ব - ২
হৈচৈ হৈচৈ রাস্তায় রাস্তায়
ঈদের বাজার দারুন ভীড়।
ঝক ঝকে দোকানে
কাপড় জামা রঙ চঙে
গয়নাগাঁটি, জুতোচটি পরিপাটি।  
বিরিয়ানী, কোর্মা, পোলাও,
বিকোচ্ছে মেঠাই, মন্ডাও।
--
গলদঘর্ম ছেঁড়া জামা কাপড় পরা শিশুর দল,
ছোট ছোট হাত গুলি বাসন ধুচ্ছে আর ধুচ্ছে
ছোট ছোট নোংরা পা গুলি ছুটছে আর ছুটছে
বোঝা বইছে আর বইছে, মালিকের চোখ রাঙানি,
ক্ষুদে খরিদ্দারের তুই তুকারি, বড়োদের ধমকানি। 
খিদে তৃষ্ণায় কচি মুখগুলি শুকিয়ে আমসি 
কেউ দেখে না নির্বাক কান্না ভেজা সরল চোখগুলি। 
-------------------------------------------------

পর্ব - ৩
ঈদের চাঁদ কি নামবে বৃষ্টি ভেজা পিচ্ছিল সিঁড়ি বেয়ে
জগন্নাথের রথ কি  চলবে বৃষ্টি ভেজা পিচ্ছিল রাস্তা দিয়ে !

ও সিঁড়ি, ও রাস্তা পিছল নয় বৃষ্টিতে, পিচ্ছিল
কত শত আজান আর রথের ভেঁপুর সুরে
কত শত কচি রক্ত, ঘাম, আর অব্যাক্ত চোখের জলে। 
------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
























3 Jul 2016

মানব ধর্ম


মানব ধর্ম
******
আমি এক সাধারণ মানুষ
মানবিকতাই একমাত্র ধর্ম
মানুষকে আমি ভালোবাসি
সেই আমার একমাত্র কর্ম।
--
আমি মনুষ্যত্বের পূজারি
সেই আমার একটি মাত্র সুখ
মানুষ কেন মানুষ মারে 
সেই আমার একটি মাত্র দুখ। 
--
মানব জাতি পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ 
জাতিভেদে নেই আসক্তি 
জনতা আমার একমাত্র ঈশ্বর
গণদেবতাই একমাত্র শক্তি।
------------------------------------------------------------------------------------------------------