22 Nov 2019

কর্ষিত জমিন

কর্ষিত জমিন
************
সত্তর সালের ডিসেম্বর মাস, অফিস টাইম, স্টেশনের লোক্যাল ট্রেনগুলিতে উপচে পড়া ভীড়। দুটি কিশোর আর একটি কিশোরী ধস্তাধস্তি করছে হাওড়াগামী ট্রেনে ওঠার জন্য, কিন্তু কিছুতেই একসাথে ট্রেনে উঠতে পারছে না। একজন ওঠে তো বাকী দুজন নীচে থেকে যায়, ফলত প্রথম জনকেও নেমে আসতে হয়। এমনিতেই এখান থেকে হাওড়ার ট্রেনের সংখ্যা কম। শেষে তারা ঠিক করে স্টেশনের বেঞ্চে বসে নিজেদের কাজের কথা বার্তা সেরে নিয়ে অফিস টাইমের ভীড় কমলে ট্রেনে ওঠার চেষ্টা করবে। একটু পরে ভীড় কেটে গেল বটে পরের ট্রেন প্রায় ঘন্টা খানেক বাদে। ট্রেনের অপেক্ষায় থেকে, নিজেদের মধ্যে কথা বার্তা বলতে থাকে।
--
কপাল মন্দ ! জাঁদরেল এক টিকিট চেকার এসে তাদের ধরে বলে তারা নিশ্চই বিনা টিকিটে ট্রেনে এসেছে। স্বভাবতই তারা প্রতিবাদ জানায় ,"আমরা হাওড়া স্টেশনের ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছি, এইতো আমাদের কাছে হাওড়া যাওয়ার টিকিট আছে।" "তাহলে তোমরা কর্ড লাইনের ট্রেনে বিনা টিকিটে এখানে এসেছ, হাওড়ার টিকিট কেটে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছ। অনেকক্ষন ধরে তোমাদের আমি লক্ষ করছি, এখানে বসে গল্প করছ।" " হ্যাঁ ,তা করছি কারণ অফিস টাইমের ট্রেনে এত ভীড় যে আমরা উঠতে পারছিলাম না।" "তোমরা সব বিশ্ব বখাটে ছেলেমেয়ে, টিকিট ফাঁকি দিয়ে এখন গল্প বানাচ্ছো। চলো অফিসে, স্টেশন মাস্টারের ঘরে।" "ঠিক আছে চলুন ", বলে তিনজন চেকারের পেছন পেছন স্টেশন মাস্টারের অফিসে যায়।
--
সেখানে বেশ জনা কতক ট্রেনের কর্মচারী বসেছিলেন। দু /চার জন উৎসাহী লোকজনও জুটে গেল। নানা রকম টিকা টিপ্পুনি শুরু হয়ে যায়। "কিহে বিনা টিকিটে ট্রেনে সফর করছ "  "ওহে, এই বয়সেই প্রেম করছো ", " কি বেহায়া মেয়ে দেখেছেন, একজন দুটোকে নাচাচ্ছে ", ইত্যাদি ইত্যাদি। ওরা তিন জন প্রতিবাদ করে উঠলো, " আমরা মোটেও বিনা টিকিটে ট্রেনে চড়িনি, আমাদের সাথে টিকিট আছে ", "কেন আজেবাজে কথা বলছেন, আমরা বন্ধু, এক পাড়ায় থাকি।"
এই ভাবে তর্ক বিতর্ক চলে, ঝামেলা বেশ পাকিয়ে উঠল। কেউ বলে আচ্ছা 'ধড়িবাজ', কেউ বলে 'বেয়ারা, বখাটে ', কেউ বলে 'কান ধরে ওঠ বস করান।'  শেষ পর্যন্ত স্টেশন মাস্টার বলেন, "কই দেখিতো হাওড়ার টিকিট কই?"
--
ওদের মধ্যে লিডার গোছের ছেলেটি তিনটি টিকিট বার করে দেয়। স্টেশন মাস্টার টিকিট তিনটি হাতে নিতেই সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ে। একজন  চেকার স্টেশনমাস্টাররে  হাত থেকে টিকিট তিনটে নিয়ে বলে ওঠেন," আরে একি, তোমাদের মধ্যে কে নাবালক ?" লিডার গোছের ছেলেটি বলে,"আজ্ঞে আমি, মানে হাফ টিকিটটা আমার। আর ফুল টিকিট দুটি ওদের দুজনের।" সবাই হো হো করে হেসে ওঠে। কিশোরটিও সবার দিকে তাকিয়ে মোলায়েম একটা হাসি ছাড়ে। এদিকে কিশোরীটি আর অপর কিশোরটি তো অবাক তাদের সাথীর দিকে তাকায় আর ভাবে, "এটা কি উদ্ভট কাজ করেছে আকাশ, আর কেন করেছে ! ওর কি মাথাটাই খারাপ হয়ে গেছে, তিনজন সাবালক তারা, তাহলে কেনই বা দুজনের ফুল টিকিট আর একজনের হাফ টিকিট!" মাথা মুন্ডু খুঁজে পায় না।
--
চেকারটি আকাশ কে ধমকে ওঠে," চুপ করহে বাচাল ছোকরা, এখনই পুলিশে তুলে দেব তিনজনকে। " আকাশ গম্ভীর ভাবে বলে, "না ,তা আপনি করতে পারেন না, আমাকে পুলিশে দিতে পারেন হাফ টিকিটের জন্য, কিন্তু ওদের দুজনকে পুলিশে দিতে পারেন না, ওদের তো ফুল টিকিট আছে। "  সঙ্গে সঙ্গে প্রথম সেই জাঁদরেল চেকারটি লাফিয়ে পড়ে, "দাঁড়াও, তোমার হাফ টিকিট আর ফুল টিকিট বার করছি। প্রথমেই আমি বলেছিলাম বিনা টিকিটে ট্রেন ধরে কর্ড লাইন থেকে এখানে এসেছো, হাওড়ার ট্রেন ধরার জন্য। মেন্ লাইন বলে ভয়ে দুটো ফুল আর একটা হাফ টিকিট কেটেছ , আর মিথ্যা কথা বলেছ। " আকাশ বলে." আমরা মিথ্যা কথা মোটেও বলিনি। "
--
এবার কিশোরী আর অন্য কিশোরটি ময়দানে নামে," দেখুন,ও খেয়াল করেনি। নাহলে দুটো ফুল টিকিট কাটল যখন এক তখন একটা হাফ কাটবে কেন! আমরা হাফ টিকিটের বদলে আর একটা ফুল টিকিট কেটেঁ নিচ্ছি। আমাদের বিরাট ভুল হয়ে গেছে, মাফ করে দিন। " "কভি নেহি ,পুলিশে তোমাদের দেবই দেব। কদিন জেলে ঘানি টেনে এস তবে তোমাদের শিক্ষা হবে বাছাধন। " কিশোরী টি আস্তে আস্তে স্টেশন মাস্টারের কাছে ঘেসে বলতে শুরু করল," দেখুন মাস্টার  মশাই , আপনিই ভাবুন এই রকম ফাঁকি কেউ দেয়, হয় টিকিট কাটে না, নয়তো তিনটেই হাফ টিকিট কাটে। একসাথে তিনজন সাবালক যাচ্ছি, সেখানে এ রকম বোকামি ইচ্ছে করে কেউ করে !" " আমিও তো বুঝে উঠতে পারছি না, এ কি রকম বুদ্ধি ! আর তুমি মা একটা মেয়ে সঙ্গে আছো, কি যে করি !" জাঁদরেল চেকার টি চেঁচিয়ে ওঠে, "মাস্টারমশাই আপনি নরম হবেন না। ওদের পুলিশেই দিতে হবে। "
--
এবার উপস্থিত মানুষদের মধ্যে দুটো ভাগ হয়ে গেল। কেউ বলে 'পুলিশে দেওয়া ঠিক,'  বিরোধী পক্ষ বলে 'ছেড়ে দিন, অল্প বয়েসের ছেলে মেয়ে, কিছু একটা গন্ডগোল হয়ে গেছে, সঙ্গে একটা মেয়ে আছে'  ইত্যাদি, ইত্যাদি। দু /চার জন আবার বললে, 'কিন্তু সত্যি কি ঘটনা হয়েছে সেটা জানা দরকার।' হটাৎ আকাশ সবাই কে চমকে দিয়ে বলে উঠল, "আমার কাছে দুটো ফুল আর একটা হাফ টিকিটের বেশী পয়সা ছিল না, আমরা তিনজন গরীব মানুষের পার্টি করি, আজ আমাদের কলকাতায় ফিরতেই হবে তাই এ ছাড়া উপায় ছিল না ," আকাশ মুখ খোলার সাথে সাথে অপর কিশোর টি ও তাদের রাজনীতি প্রচার করতে শুরু করে দিল। কিশোরীটি ব্যাগ থেকে পার্টির কাগজ পত্র বার করে বিলোতে থাকল। তিনজন তিনটে গ্রূপ করে তাদের পার্টির মতাদর্শ প্রচার করতে শুরু করে দিল। নির্বাক হয়ে জনতা তাদের কথা শুনলো। কাগজ পত্র পকেটে পুরে ফেললো। অনেকেই বলে ফেলল," সত্যি এই সমাজ টাকে বদলানো দরকার, তোমরা হয়তো পারবে। আমাদের শুভেচ্ছা তোমাদের সাথে থাকল। "
--
ইতিমধ্যে হাওড়াগামী ট্রেন স্টেশনে ঢুকছে। স্টেশনমাস্টার তিনটে ফুল টিকিট ওদের হাতে দিয়ে বলল ,"এ রকম ভুল আর কোরনা, সাবধানে থেক। " জাঁদরেল চেকার টি ওদের সঙ্গে করে খালি কামরা দেখে  ট্রেনে উঠিয়ে দিয়ে বলল ,"সাবধানে যেও ভাই। " আর ট্রেনে উঠেই অন্য কিশোর আর কিশোরী দুজনে মিলে দুদিক থেকে আকাশের দুই কান ধরে টেনে ধরল, "হতভাগা  আমাদের বাঁচিয়ে নিজে শহীদ হতে গিয়েছিলি। তবে জনতা যে সত্যিকারের কর্ষিত উর্ব্বর জমিন, প্রয়োজন শুধু উৎকৃষ্ট বীজের, এটা আবার প্রমান হল।  "
--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
              










1 Oct 2019

কাশ্মীর

কাশ্মীর
******************

শৈশব বন্দী ভয়ের শেকলে
কৈশোর কে বেঁধেছি কাঁটাতারে
যৌবনের তরে বুলেট বৃষ্টি অকাতরে
প্রবীণ আর বৃদ্ধদের ভরেছি কারাগারে।
-----
তবুও জব্দ হয়নি জনতা
মনোবল ওদের আজও অক্ষুন্ন
মোদের হাতে যে অসীম ক্ষমতা 
প্রতিবাদের ঝড়ে তা অতি নগন্য।
-----
দুস্তরলোভ,পৃথিবীটাকে আস্ত
গিলে খাবার বাসনা মোদের,
কিন্তু দমরুহাতে প্রলয়ঙ্করী
তান্ডবনৃত্য  জনতানটরাজের।
-----
মুক্তির স্বপ্ন ওদের পাখির ডানায়
ডাকাতিয়া বাঁশীর নেশায় মাতাল
রোখে সাধ্য আছে আর কার,সূর্য্য
উঠবে চারিধার করে লালে লাল।
শেষ জয়ের হাসি হাসবে পাহাড়
অত্যাচারীর মুখে গ্রহণের আঁধার।
-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

20 Sept 2019

বহতা সময়ের অঙ্গীকার

বহতা সময়ের অঙ্গীকার
*****************

নিতান্ত আটপৌরে যাপনেও কোথায় যেন
একটা বিষম রকম চিড় খেয়ে গেছে ,
সকালের চা আর খবরের কাগজ মধ্যবিত্ত জীবনে
এক চলমান চিরাচরিত ধারাতেও ঘুন ধরেছে,
কাগজের প্রতিটি পাতা যেন নিঃশব্দ চোখের জল
চায়ের কাপে মিশে মিশে স্বাদহীন করে তোলে।
--
অনাহার, অর্ধাহার, আত্মহত্যা, খুনোখুনি, ধর্ষণ
বেশ কিছু হল প্রতিদিনের ডাল ভাতের মত জোলো,
নোটবন্দী, দেশের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে অনায়াসে
বিদেশে পালানো যেন নেহাৎ ই ছোট্ট একটু মশার কামড়।
বিদেশীদের কাছে প্রাকৃতিক সম্পদ, জনতার জন্মসূত্রে অর্জ্জিত
অধিকার গুলি কোন অদৃশ্য হাতের খেলায়  বিক্রী হয়ে যাচ্ছে।
স্কুল কলেজে গুন্ডাবাজী দেখে দেখে আমাদের চোখ ক্লান্ত
নোঙ্গর ফেলা জীবনে সব কিছুই স্বাভাবিক ভাবে ঘটে চলছে।
--
কিন্তু আসামে দেশের মানুষ যখন বিদেশী তকমা পেয়ে ক্যাম্পে
বাস করতে বাধ্য হয়, কাশ্মীর যখন সংবিধান স্বীকৃত অধিকার খুইয়ে
কাঁটাতারের ঘেরাটোপে থাকে, আত্মীয়স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায়
সেনাপরিবেষ্টিত বসতি, যখন নিত্যদিন বুলেটবৃষ্টি ঘটে চলে সেখানে,
তখন দাঁড়িপাল্লার মত দোদুল্যমান জীবনেও ঘূর্ণাবর্ত সৃষ্টি হয়।
--
যাঁরা চিরকাল ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়েছে,তাঁদের ফেলে যাওয়া
পদচিহ্নের ওপর যে পলিমাটির স্তর সৃষ্টি হয় তাতে সোনাগলা ফসল
ফলে, দিগন্তের কোনে ঝুলে থাকে লাল সূর্য, রাতের সাগরে
ডুব দিয়ে ওঠে অজন্তার পূর্ণিমার চাঁদ, ফুলের মত অসংখ্য তারা,
হৃদয় মোচড়ানো কান্না পরিবর্তিত হয় বহতা সময়ের নুপুর ঝংকারে।
নির্মল শিশির সিক্ত পরিযায়ী বাতাসে মন্দ্রিত কণ্ঠে ধ্বনিত হয়,
"এই পৃথিবীর মানুষ আর নতুন করে কোন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প
বা ইহুদি ঘেটো তৈরী করতে দেবেনা, দেবেনা, দেবেনা। "
---------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------














3 Sept 2019

শান্তিমাসীর ঘরকন্না

শান্তিমাসীর ঘরকন্না
***************
শান্তিমাসী জেলে এসেছিলেন পাসপোর্ট কেসে। তখন তাঁর বয়স ৩০এর মধ্যে, বাংলা দেশের মানুষ। ছোটখাটো কিন্তু কর্মঠ চেহারা। সম্ভবত বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত, গলায় তুলসীর কন্ঠী, নাকে রসকলি আঁকা। মনটি ছিল দয়ামায়ায় ভরপুর।
মাসীর কাছে শুনেছিলাম খুব কৈশোরেই  দোজবরে বিয়ে হয়েছিল। স্বামীর আগের পক্ষের দুটি ছেলেই শান্তিমাসীর থেকে বয়সে বড়, এবং বিবাহযোগ্য ছিল। তথাপি ছেলেদের বিয়ে না দিয়ে শ্যামলা চেহারায় মিষ্টি মুখশ্রী ও ফুটন্ত যৌবনের টানে স্বামী নিজেই বিয়ে করেন। সংসারে স্বাচ্ছন্দের অভাব ছিলনা। কিন্তু বিয়ের সাথে সাথেই স্বামী গোয়াল সামলান, ঘর সংসারের যাবতীয় কাজ, ধানভানা, চিঁড়েকোটা, সবজি বাগান দেখভাল সমস্ত কাজ সদ্যকিশোরী মেয়েটির উপর চাপিয়ে দিয়েছিল, যাতে তাঁকে সারাদিন ব্যস্ত রাখা যায়।
--
মানুষটি ছিল প্রচন্ড সন্দেহপ্রবন ও কামুক প্রকৃতির। ঘরে দুটি জোয়ান ছেলে, তাই কঠোর নজরদারী। কাজের তোড়ে বউ এর যখন নিশ্বাস ফেলার সময় নেই তখন এসে নিজের শারীরিক খিদে মেটাত, দিনের মধ্যে কত বার যে এ ঘটনা ঘটাত তার ঠিক ঠিকানা থাকত না। শরীরে না পোশালেও কোন রেহাই ছিল না, আপত্তি করলে পৈশাচিক ভাবে তাকে ধর্ষণ করত। একটা  সময়ের পর মাসীর মনে মাতৃত্বের সাধ জাগে, কিন্তু সে গুড়েও বালি। এদিকে নিজের প্রৌঢ়ত্বের অক্ষমতা তার স্বামীকে আরও ক্ষিপ্ত করে তুলত। নাতনীসম কিশোরী মেয়েটির মন বা শরীরের খবর রাখা স্বামীর দায়িত্বের মধ্যে পড়ত না, শারীরিক খিদে মেটান আর সংসারের সাশ্রয় করার কল ছিল সে। সব সময় সন্দেহ যে জোয়ান ছেলে দুটির প্রতি আকর্ষণ বশতঃ শান্তিমাসীর তার প্রতি অনীহা।  এত বিকৃত অত্যাচার দিনের পর দিন সহ্য করতে করতে মাসীর জীবন অসহ্য হয়ে ওঠে, পরিত্রানের পথ খুঁজতে থাকেন।
--
সুযোগ এসে যায় বাংলাদেশ মুক্তি যুদ্ধের কিছুকাল পরে কিছু পরিচিতজন ও স্বজন পালিয়ে চলে  আসছিল। মাসী তাঁদের সাথে চুপি চুপি ঘর ছেড়ে পালিয়ে আসেন। পথে সীমান্তরক্ষীদের হাতে পড়েন, এ থানা ও থানা ঘুরে প্রেসিডেন্সি জেলের হাজতী নম্বরে ঠাঁই পান। ধীরে ধীরে এখনকার ব্যাপার স্যাপার বুঝে নেন। আস্তে আস্তে  আমাদের সাথে আলাপ হয়, আমাদের মধ্যে বুলুর সাথে মাসীর বেশী ভাব জমে ওঠে। তাছাড়া হাজতি নম্বরে মদিনা, হাসিনা, হাওয়া বিবি, শোভা, মিতাদের স্নেহ দিয়ে কাছে টেনে নেন, ক্রমে তাঁদের গার্জিয়ান হয়ে ওঠেন। কোন সময়ে কোন কারণে তাঁরা অবাধ্যতা করলে দু কথা শোনাতে ছাড়তেন না, আবার কারোর শরীর বা মন খারাপ হলেও সেবাযত্ন আর হাসি মস্করা করে তাঁদের ভুলিয়ে রাখতেন। কিন্তু কোন কারণে যদি ওঁর কথা না শুনতো বা মাসীর মুখে মুখে কথা বলত, তিনি চোখের জল ফেলতে ফেলতে মেয়াদী নম্বরের গরাদের কাছে, আমাদের সাাথে ফাঁক দিয়ে কথা বলার জন্য ছুটে আসতেন, তাঁর কষ্টের কথা জানাতেন, "দ্যাখতো, আমার তো সত্যকার ঘরকন্না তো কোনদিন হইল না, মা হইতে পারি নাই।  অদের দিয়া ঘরকন্নার স্বাদ মিটাই, মা না হওনের দুখ ভুলি। হেয়ারা হেই কথাডা বঝতে চায় না। অদের যা কোই, অদের ভালার  জন্যি তো কোই।" আমরা তাঁকে বুঝিয়ে শান্ত করতাম, দোষী ব্যক্তি কে একটু বকতাম, মিটমাট হতে সময় লাগত না। অবশ্য শান্তি মাসীর চোখের জল ওরা সহ্য করতে পারত না,  তাই বেশীর ভাগ সময়েই ওরা নিজেরাই মিটমাট করে নিত।
--
শান্তি মাসীর পুষ্যিদের মধ্যে বেশ কজন হারানো বাচ্চা ছিল, যাদের কেউ দেখার ছিল না। জেল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে ওরা নাম কে ওয়াস্তে ছিল, ওদের প্রকৃত আশ্রয় ছিল শান্তি মাসী। কে খাবাার ধরেনি, মাসী দালাল আর মেটদের সাথে নরমে গরমে কথা বলে তার খাবার ধরে নিয়ে আসতো, না পেলে নিজের খাবারের থেকে ভাগ দিত। কোন বন্দিনী অবাক হলে মাসী বলতেন,  " অরে আমাগো না খাইয়া থাকার অভ্যাস আসে, হেয়ারা পোলাপান মানুষ, ক্ষিদা সঝ্য করবো ক্যামনে !" জেলের ভিতর ক্ষিদে সহ্য করা যে কি কঠিন, সকালে এক মুঠো মুড়ি, দুপুরে এক ডাব্বু ভাত আর ডালের নামে একটু হলুদ জল, চিমটি খানেক তরকারি নামক এক বিশেষ ধরনের ঘ্যাট, বিকালে তিনটে আধা কাঁচা রুটি আর সেই ডালের জল আর ঘ্যাট। এতে একজন জোয়ান মানুষ কেন বাচ্চাদেরও পেট ভরে না, সেই মুষ্টিভর  অন্ন অনায়াসে বিলিয়ে দিতে যে পারে তাঁর আত্মত্যাগের কথা নতুন করে বলার প্রয়োজন হয় না।
--
কোন বাচ্চা চান করেনি, গায়ে বাহ্যি পেচ্ছাপ লাগিয়ে ফেলেছে, জলের কলের কাছে প্রচন্ড ভীড়, কাছে যাবার উপায় নাই। মাসী ঠ্যালাঠেলি করে নিজের খাবার থালায় জল ভরে ভরে এনে উঠোনের ধারে দাঁড় করিয়ে সেই অভাগাটিকে চান করিয়ে, নিজের কাপড়ের আঁচল দিয়ে মুছে দিতেন। মেট্রন, ওয়ার্ডাররা জায়গা নোংরা করার জন্য বকলে হেসে বলতেন, "চিন্তা কইরেন না, পরিষ্কার কইরা দিমু , জল না পাইলে নিজের কাপড়খানা দিয়া মুইছা দিমু হনে। হেয়ারা গুমুত মাইখ্যা রইলে কি জ্যালার, হুপারের (জেলার,সুপার ) কাসে আপনাগো বদনাম হইব না," জোঁকের মুখে নুন পড়ত। কোন বাচ্চার জ্বর হয়েছে, মাসি মেট্রন, ওয়ার্ডার মেটদের প্রায়  হাতে পায়ে ধরে ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধপথ্যি আদায় করে ছাড়তো। তা সম্ভব না হলে, ভাল ওয়ার্ডার বা ভাল মেট থাকলে অথবা ডায়েট আছে এমন বন্দিনীদের কাছ চেয়ে চিন্তে  দুধপাউরুটি জোগাড় করে খাওয়াত, ওষুধের বদলে নিজের রাতে খাবার থালার জলের মধ্যে কাপড়ের কোনা ভিজিয়ে জল পট্টি দিত। ওই এক থালা জলই মাসীর রাতের খাবার জন্য ধরা থাকত। মাতৃহীন ছেলে মেয়েরা শান্তিমাসীর কাছে মাতৃস্নেহ পেয়ে তাঁকে আঁকড়ে ধরে, মায়ের মতই ভালোবাসত।
--
এসব  দেখে মেট্রন, খারাপ ওয়ার্ডার আর দালাল বন্দিনীরা খুশী হত না। হিংসায় মেট্রন একদিন হারানো বাচ্চাদের দেখার দায়িত্ব আনোয়ারা নামে এক দালালের হাতে তুলে দেয়। আনোয়ারা অল্প বয়সে ইঁট দিয়ে তিনজন বাচ্চার মাথায় মেরে খুন করে জুভেনাইল মার্ডার কেসে বন্দিনী হিসাবে জেলে এসেছিল। বাচ্চাদের দিয়ে সে তার স্নানের জল জোগাড় করা, চুলে, গায়, হাতে, পায়ে সাবান মাখানো, তেল মাখানো এসব কাজ করাত, কেউ কোন কাজ না পারলে প্রচন্ড মারধোর করত। অদ্ভুুুত একটা হিংস্রতা ছিল তার চরিত্রে। স্বাভাবিক ভাবেই শান্তি মাসির মাতৃত্ব বোধে প্রচন্ড ঘা লাগে। তখন হাসিনারা সকলে মিলে ঘিরে রাখে। নানা আবদারে তাঁকে ব্যস্ত করে রাখত, গ্রামের প্রচলিত নানান ছড়া, গান, গল্প শুনতে চাইত।ওঁদের সেসব শোনাতে গিয়ে নিজের বেদনা ভুলে যেতেন। পরবর্তীকালে যতদিন জেলে ছিলেন সবুরজানের মত ছোট ছোট শিশুগুলির দেখভাল তিনিই করতেন। মেট্রন মনেপ্রাণে সেটা মেনে নিতে না পারলেও কিছু বাধা দেয়নি কারণ এতটুকু বাচ্চাদের দেখভাল যে তার দালালবাহিনীর দ্বারা সম্ভব নয় তা সে ভালই বুঝতো।
--
মাসী নিজের জন্য এক কণা জিনিষ কোনদিন কারও কাছে চাননি, বা নিজের জন্য কখন কোন দয়া ভিক্ষা করেননি। প্রখর আত্মসন্মানবোধ তাঁকে জেলের কুৎসিত প্রভাবগুলি কে ঘৃণা করতে শক্তি যোগাত। আবার যেদিন হাওয়াবিবি, মিতা, শোভা, হাসিনা, মদিনার মত জনা ১৫/২০ মেয়ে কম খাবার দেবার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল শান্তি মাসি কিন্তু তাঁদের পাশে ছিলেন। একটাই কথা তাঁর, "আমার মাইয়াগুলান লড়াই করথে গিয়া শয়তানগুলানের হাতে মাইর খাইব আর আমি দূরে দাঁড়াইয়া দেখুম, তা আমার ধরমে সইব না। " তাঁর মাতৃত্ববোধ এমনই মহান ছিল।        
----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------


























    

29 Aug 2019

খুঁড়িয়ে চলা মানুষ

খুঁড়িয়ে চলা মানুষ
***************
দারুচিনি রোদেও যেখানে কবরের অন্ধকার
বাউল বাতাসে শুধুই শ্মশানের নিস্তব্ধতা
কবিতার আকাশে কান্নাভেজা বিষণ্ণ জোৎস্না,
প্রতিটি মুহূর্তে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা কষা
নরকের মাঝে দিন কাটানোর চেয়েও ভয়ংকর,
যাযাবর মেঘ সেখানে রক্তের আলপনা দেয়
পিঠ কুঁজো করা সময় মৃত্যুর চেয়েও দুঃসহ
কাশ্মীরের ফুলের কলিতে বেয়নেটের খোঁচা,
আমরা জীবন যুদ্ধে হেরে যাওয়া ছাপোষা
মানুষের দল তখনও খুঁড়িয়ে চলেছি।
--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

26 Aug 2019

গোপাল, তুই স্মৃতিতে আছিস আর থাকবি

গোপাল, তুই স্মৃতিতে আছিস আর থাকবি
********************************

কিছুদিন আগে পুরাতন এক বন্ধুর কাছে শুনলাম মাস কয়েক আগে গোপাল স্ট্রোকে মারা গেছে। প্রায় বছর ১৫/২০ আগে বোধহয় ওর সাথে শেষ দেখা হয়েছিল। কিন্তু ও যে আর নেই এখনও ভাবতে পারিনা, ৭২/৭৩ সালে আলাপের দিন থেকে  প্রতিটি স্মৃতি আজও ছবির মত মনের স্মৃতিকোঠায়  ভাস্বর হয়ে আছে। এখনও ওর সদা হাসিমাখা মুখটা চোখে ভাসে। একটা চূড়ান্ত দুঃখের সময় ও যেন দুহাত বাড়িয়ে আমাকে সব আঘাত থেকে আগলে রেখেছিল।
--
আমাদের সাথে অনেকগুলি গোপাল নামে সাথী ছিল। এই গোপাল কাঠের দোকানে খুব ভাল পালিশ মিস্ত্রির কাজ করত, তাই ওর নাম হয়ে গিয়েছিল কাঠগোপাল, অনেক সময় ওকে শুধু কাঠ বলেও ডাকা হত। আমার সাথে ওর দেখা ৭২এর শেষ ভাগে, যখন আমার চারপাশের ঘনিষ্টরা আর কাজের সূত্রে যুক্ত বেশীর ভাগ সাথীরা ধরা পড়ে গেছে। মনটা ভীষণ খারাপ, কাজের ক্ষেত্রে নতুনদের সাথে যোগাযোগ হয়ে ওঠেনি। মতাদর্শের ক্ষেত্রেও পার্টির ভিতর বিরোধ দেখা দিয়েছে।
--
মনের অবস্থা ঠিক এতটাই খারাপ ছিল যে মাঝে মাঝেই চোখে জল চলে আসত। গোপালের দোকানে যেদিন প্রথম গেলাম, শুনলাম আর একজন সাথীর খবর পাওয়া যাচ্ছে না। শুনেই আমার চোখে জল এসে গেল দেখে ও খুব অপরাধীর মত মুখ করে বলল, " লক্ষীসোনা বোনটি কাঁদিস না, তাহলে আমিও কেঁদে ফেলব কিন্তু। " ওর কথা বলার ধরণে এমন একটা আন্তরিকতা আর সৌহার্দ্য ছিল, আমি অনেক কষ্টে নিজের কান্না গিলে ফেললাম।
--
তারপর থেকেই ওর সাথে যোগাযোগটা পাকাপাকি হয়ে গেল। মন খারাপ লাগলে ওর দোকানে গিয়ে অক্সিজেন সঞ্চয় করে আসতাম। গেলেই জিজ্ঞাসা করত খিদে পেয়েছে কিনা বা কখন খেয়েছি, কি খেয়েছি। নানা রকম গল্পে গল্পে  মনটা ফুরফুরে হয়ে যেত। সব সময় জিজ্ঞেস করত রাতের থাকার জায়গা ঠিক আছে কিনা, নাহলে দোকানে চলে যেতে বলত। ওর  বাড়ীতে শুধু মা ছিলেন। ওর  গ্রামে বা পরিচিত অন্য কোন গ্রামে রাতের ট্রেনে ওর সাথে চলে যেতাম, কাকভোরে বেরিয়ে আসতাম। একবার কি যেন একটা উৎসবে ওর সাথে আমরা তিন জন সাথী মিলে গিয়েছিলাম। ওর বাড়ীতে একটা হাঁস ছিল, সেটাকে কাটল আর মাকে ভাল করে রান্না করতে বলল আমাদের খাওয়াবার জন্য। তারপর আমাদের নিয়ে গ্রাম ঘুরতে বেরোলো।
--
কি যেন উৎসব ছিল, বাড়ীতে বাড়ীতে ঘুরে নতুন কোটা চিরে আর গুড় খেয়ে আমার পেট ঢাক হয়ে গেল। বাড়ী ফিরে আমি আর হাঁসের মাংস ভাত খেতে পারছিনা দেখে খুব রেগে গেল, মন খারাপ করতে লাগল। আমিতো কোন মতে এক টুকরো মাংস খেলাম,ওকে উল্টে বকতে শুরু করলাম, "তুই কেন সারা গ্রাম ঘুরে চিরে গুড় খাইয়ে আনলি, তাইতো আর খেতে পারছি না। ছেলেরা অবশ্য ওর আশা পূরণ করে দিল। তখন একটু ঠান্ডা হল।
--
গোপালের কাজের ফাঁকে ফাঁকে নানা জায়গায় ঘুরে, শ্রমিক দের কারখানায় গেটে অপেক্ষা করে নতুন করে শ্রমিকদের মধ্যে যোগাযোগ করা, পুরান বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ গুলিকে নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা করতাম। সে সময়
শহরে আমাদের থাকার জায়গা গুলি পুলিশের নজরে এসে যাওয়ায়, প্রায়ই গোপালের সাথে বিভিন্ন গ্রামে ওর পরিচিতদের বাড়ী আশ্রয় নিতাম। একবার ওর গ্রামের থেকে একটু দূরে আমরা পোস্টার লিখতে গেছিলাম। কাছেই একটি ক্লাবে যাত্রার রিহার্সাল হচ্ছিল, আমাদের হটাৎ দেখতে পেয়ে তারা বেরিয়ে আসে," কি ব্যাপার আপনার কে, এখানে কি করছেন ?" স্বভাবিকভাবেই আমাদের প্রশ্ন করতে শুরু করল, সঙ্গে  এত রাতে একটা মেয়ে থাকায় সন্দেহটা ঘনীভূত হয়।
--
আমরা তখন আমাদের পার্টির শিক্ষা মত অসুবিধায় পড়লে জগণের কাছে, বিশেষ করে শ্রমিক/ কৃষক কে আমরা সোজাসুজি আমাদের পার্টির নাম ও রাজনীতির কথা বলতাম। দেখেছি এসব ক্ষেত্রে খুব ভালভাবে মানুষ আমাদের গ্রহণ করেছে, অনেক সময়ে সেখানে পার্টি ইউনিট গড়েও তোলা গেছে। তাই আমরা সরাসরি আমাদের রাজনীতি ও উদ্দেশ্য খোলাখুলি বললাম। তাঁরা সব মন দিয়ে শুনলেন, সাবধান করে দিলেন।" খুব ই ভাল আপনাদের উদ্দেশ্য, ভাল কাজ করছেন, কিন্তু প্রতিরোধ বাহিনী গ্রামে গ্রামে টহল দেয়,আর রাত না করে বাড়ী চলে যান। " আমরা তাঁদের শুভেচ্ছা জানিয়ে ফিরে আসি।
--
বাড়ী থেকে যখনই মুড়ি / চিড়ের মোওয়া, নারকেল নাড়ু ইত্যাদি আসত ও আমাদের জন্য সরিয়ে রেখে সহকর্মীদের সাথে ভাগ করে খেত। খুব বড় মন ছিল, শেষ কপর্দক ব্যয় করে সবাইকে খাওয়াতে ভালবাসত। একবার গোপাল আর আমি এক শীতের রাতে শেষ ট্রেনে ওর গ্রামে যাচ্ছি। ট্রেন প্রায় ফাঁকা। আমরা বলাবলি করছিলাম প্রায় রোজ রাতে ওর গ্রামে যাওয়া টা ঠিক হচ্ছে না , শহরের অবস্থা ভাল যাচ্ছে না, গ্রামে নতুন করে কৃষকদের মধ্যে সংগঠন গড়ে তোলা দরকার। কামরায় আমরা দুজন ছাড়া আর একজন মাত্র ছিলেন। সঙ্গে একটা বিরাট ফাঁকা সবজি বওয়ার ঝুড়ি, আমাদের মনে হল উনি সম্ভবত গ্রামের কৃষক, ক্ষেতের সবজি শহরে বিক্রি করে গ্রামে ফিরছেন। নতুন যোগাযোগ গড়ে তোলার একটা বিরাট সুযোগ।
--
আমরা  কাজে লেগে পড়লাম, ওনার সঙ্গে গল্প করতে শুরু করলাম, কি কাজ করেন, বাড়ী কোথায়, কে কে আছেন ইত্যাদি। দেখলাম আমাদের আন্দাজ ঠিক আছে। ইতিমধ্যে ওনার ষ্টেশন চলে আসতে, নেমে গেলেন। আমরাও তাড়াহুড়ো করে তাঁর সঙ্গে নেমে তাঁর পিছু পিছু চললাম অন্ধকার গ্রামের পথ ধরে। একটু এগিয়ে তাঁকে ডেকে বললাম, "আমরা ভাইবোনে গল্প করতে করতে ভুল করে আমাদের ষ্টেশন ছেড়ে এসেছি, এখন তো আর ট্রেন পাওয়া যাবে না, এই ঠান্ডায় রাতে কোথায় যাব আপনি যদি রাতে আশ্রয় দেন, তো খুব উপকার হয়। " সত্যি আমাদের এক কথায় রাতে তাঁর বাড়ীতে আশ্রয় দিতে কোন দ্বিধা করলেন না। বাড়ী নিয়ে গেলেন। সাধারণ মানুষ এই রকম মহান আর উদার ই হন, আমরা নতুন করে আবার তার প্রমান পেলাম।
--
বাড়ী পৌঁছে তিনি আমাদের পরিচয় আর দুর্গতির কথা বলে সবাইকে বলে দিলেন আমরা রাতে থাকব। একান্নবর্তী পরিবার, অল্প জমি আছে সবাই মিলে নিজেরাই জমিতে খাটেন, শহরে গিয়ে চাল নিজেরাই মহাজনকে গস্ত করেন, মরশুমি সবজি আনাজপাতি নিজেরা শহরে বাজারের ফুটপাতে বা গ্রামের হাটে বিক্রি করেন, দুঃখকষ্টে দিন কেটে যায়। মাটির বাড়ীর দাওয়ায়ে বসে কথা হচ্ছিল একধারে মেয়েদের সাথে আমি বসে কথা বলছি। আর এক ধারে ছেলেদের সাথে গোপাল বসে কথা বলছিল। আমরা ষ্টেশনে হটাৎ করে নামাতে নিজেদের মধ্যে আর কিছু কথা ঠিক করে না নেওয়াতে নিজেরা নিজেদের মত কথা বলছিলাম। হটাৎ একজন যুবক গোপালের কাছে চুপি চুপি বলে, " দাদা আপনার আর আপনার বোনের কথা কিন্তু মিলছেনা। " গোপাল বিড়ি খাবার নাম করে তাঁকে নিয়ে বাইরে গিয়ে সব সত্যিকথা বলে। ছেলেটি শুনে আমাদের পার্টি ও রাজনীতির কথা আরও জানতে খুব উৎসাহ প্রকাশ করে। গোপাল যতটুকু সম্ভব বলে আর কথা দেয় বই কাগজ পত্র নিয়ে পরে আবার আসবে।
--
পরদিন সকালে চা খেয়ে আমরা রওনা দিই। রাস্তায় এসে আমরা ঠিক করি এরপর গোপাল একাই এসে এখানে যোগাযোগ রাখবে আর সংগঠন গড়ে তুলবে। কারণ আমি সাথে থাকলে বাইরের লোকের চোখে পড়বে, তাছাড়া আমি একা গ্রামের পথ ঘাট ঠিক মত চিনে উঠতে নাই পারতে পারি। গোপাল সেখানে সত্যি একটা মজবুত সংগঠন গড়ে তুলেছিল। পরবর্তী কালে জেল থেকে পালিয়ে সেখানে গিয়েই ওঠে। তাঁরা ওকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছিল। কিছুদিন থাকার পর তাঁদের সাহায্যে অন্য জায়গায় চলে যায়।
--
আর এক রাতে আমরা তিন / চার জন গোপালের গ্রামে যাওয়ার সময় মাঝপথে আমাদের প্রতিরোধ বাহিনীর লোক জন ঘিরে ধরেছিল। "আমরা কে কোথায় থাকি, এতো রাতে কোথা থেকে ফিরছি, কোথায় যাব" ইত্যাদি নানা প্রশ্নে জর্জরিত করে। গোপাল বলে যে আমরা তিন জন ওর মামাত ভাইবোন শহরে থাকি, পিসির বাড়ী বেড়াতে এসেছি ,পাশের গাঁয়ে যাত্রা ফিরতে রাত হয়ে গেছে। সঙ্গে মহিলা থাকায় ওরা আর বিশেষ কিছু বললনা। আমরা গোপালদের বাড়ী চলে গেলাম। পরদিন পায়ে না হেঁটে আমরা বাসে করে সোজা ষ্টেশনে নামি। কথা ছিল গোপাল ছাড়া বাকীরা কলকাতায় চলে আসব আর গোপাল বাড়ী ফিরে যাবে। গোপাল ট্রেনের টিকিট কেটে আমাদের দিল। আমাদেেেরর সাথে ও নিজেও ট্রেনে উঠে পড়ল। আমরা অবাক, কি ব্যাপার বুঝতে পারলাম না। ও শুধু বলল পরের স্টেশনে নেমে একজনের সাথে দেখা করে বাড়ী ফিরবে। আমাদের কেমন যেন সন্দেহ হল, কিন্তু পরের ষ্টেশনে তাড়াহুড়া করে নেমে যাওয়াতে কিছু জানা হল না।
--
দুদিন পর ওর সাথে ওর দোকানে দেখা হতে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম, আগের দিনের প্রতিরোধ বাহিনীর একজনের সাথে ওর পরিচিত একটি খোচর কে ষ্টেশনে দেখে ও ট্রেনে উঠে পড়ে। পরের ষ্টেশন থেকে ঘুর পথে বাড়ী গিয়ে পার্টির যে কাগজ পত্র ছিল সরিয়ে দিয়ে, মাকে সব বুঝিয়ে বলে।  ভোর বেলা ট্রেন ধরতে ষ্টেশনে আসার সময় নিজের গ্রাম পার হয়ে বেশ কিছুটা আসার পথে পেছন থেকে কেউ গুলি চালায়। প্রানপন দৌড়ে ঘুরে ঘুরে অন্য ষ্টেশন থেকে ট্রেন ধরে কোলকাতায় এসেছে। আমরা সবাই খুব বকলাম আমাদের সাথে আগের দিন চলে না আসার জন্য। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে দাঁত বার করে হেসে জবাব দিল, "আরে ফিরব বলে বাড়ী থেকে বেরিয়েছি, রাতে না ফিরলে বুড়ী মা আমার চিন্তায় মরে যেত যে, আর কাগজ পত্র বাড়ীতে সার্চ করে পেলে, পিটিয়েই মাটাকে আমার মেরে ফেলত। "
--
মানুষের প্রতি, সাথীদের প্রতি ওর প্রগাঢ় দরদবোধ ওকে সব সময় মনের জোর যুগিয়েছে। ধরা পড়ার পর প্রচন্ড পুলিশি নির্যাতনেও ওর মুখ থেকে একটা কথাও বার করতে পারেনি। মৃত্যু ওকে ছিনিয়ে নিলেও মনের গভীরে আমাদের কাঠ গোপালের স্মৃতি জ্বলজ্বল করবে।  

----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

















  






    

8 Aug 2019

8 Aug, 2019 ভোর রাতের স্বপ্ন

ভোর রাতের স্বপ্ন 
*************
ভোররাতে স্বপ্ন দেখলাম 
আকাশ থেকে তুষার নয় বারুদ ঝরছে ,
শিকারাগুলির গায়ে ঝকঝকে অক্ষরে
বড় বড় শিল্পপতিদের নাম,
সস্তা শ্রমে কাশ্মীরি হাতের কাজের সম্ভার
বিকোচ্ছে মলে আকাশ ছোঁয়া দামে 
ডাল লেকের জল লালে লাল, 
পথের পাশে ফুলের কেয়ারি নয় শুধুই লাশ !
ফুটফুটে চঞ্চল কিশোরের দল 
ব্যস্ত ছিল ক্রিকেট খেলায়,
কাছেই ভারী বুটের আওয়াজ
কিশোরেরা ঝাঁপ দেয় ঝিলমে 
বাকীরা কিছু দূরে পাড়ে উঠল,
কিন্তু আলতাফ উঠল না 
সে যে সাঁতার জানতনা,
আর ছড়ড়ায় আজাহার হল অন্ধ ;
আমি আজাহার আর আলতাফের 
মুখের উপরে আমার কিশোর ছেলের 
ছায়া দেখলাম, ভোরের স্বপ্ন,
সত্যি না হয়, রামনাম জপ করি !
----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------