27 Jun 2021

দাপট

দাপট
****

একদিনের ঝড়ের দাপটে
রাধাচূড়ার নরম সোনালী
ফুলগুলি ঝরে গেছে।
বিদ্ধস্ত  বড় বড় গাছেরা
হাত পা ভেঙে পড়ে আছে।
তছনছ হয়েছে কত পর্ণ কুটীর।
প্রকৃতি চলেছে
প্রকৃতির নিয়মে ,
মানুষ বলি হচ্ছে ,
মানুষের নিয়মে।
-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

30 May 2020

অনামিকা

অনামিকা
*******
রোদের কনকচাঁপা আলোয়
কে তুমি শুয়ে আছ অনামিকা
নিস্তব্ধ, নিথর দেহবল্লরি,
চাদরে ডাকা নিঝুম, নিশ্চুপ।
---
ওঠ, চোখ মেলে চাও
দেখ তোমার বুকের মানিক
তোমাকে ডেকে চলেছে
অসহায় আকুল আধো বুলিতে।
---
ছোট্ট শরীরটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে
পড়ছে তোমার বুকের পরে
সাড়া না পেয়ে ক্ষুদে ক্ষুদে
হাতে টাানছে তোমার চাদর ।
---
ছোট ছোট পায়ে  চক্রাকারে
ঘুরছে তোমারই  চারিপাশে
ওর যে বড় খিদে পেয়েছে
তুমি ওর একমাত্র অবলম্বন।
---
বহুপথ বুঝি পার হয়ে এসেছ
পায়ে হেঁটে, দমবন্ধ বাাসে, ট্রেনে
তৃষ্ণার্ত, ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত, অবসন্ন দেহে
বুকের দুধ দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছ সন্তানকে
---
আজ তুমি  নিস্প্রান অনামিকা
ছোট্ট সোনামনিটার তো সেটা
জানা নেই, বোঝার কথাও  নয়
স্থবির চারিপাশ আজ শূন্য,খাঁ খাঁ।
---
নিশ্চল তুমি যে ভুঁয়ে পড়ে আছ
তার কান্না শিশু তো বোঝে না
বাতাসের হাহাকারও তার
অন্তরে জানান দেয় না।
---
কঠিন কঠোর সময়
বিবেহীন সমাজ শুস্ক 
চোখে শুধু  চেয়ে দেখে
দুহাত বাড়িয়ে কোলে টেনে
নেবার কেউ কোথাও নেই
নির্মম নির্দয় এক স্বার্থপর দিন।   
---
নিস্তব্দ্ধতার মাঝেও যে
শব্দ থাকে তাও এখন স্তব্ধ
ঘনঘোর অন্ধকারের মাঝে যে
আলো থাকে তা নিশ্ছিদ্র কালো
মানুষ আজ মুক, অন্ধ, বধির !
এ শিশুই হয়ে উঠুক আগামী দিনের যীশু।
--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------











17 May 2020

লংমার্চ

লং মার্চ
********

সৃষ্টিকর্তার রক্তে হোলি খেলা চলছে
যাঁরা সভ্যতার ইমারত গড়ে
সমাজ আর জীবনের স্তম্ভ যাঁরা,
প্রতিদিন দেশজুড়ে তাঁদের রক্তের আলপনায়
রাঙা হচ্ছে রাজপথ, মেঠোপথ, নদীপথ, রেলপথ।
----
বুভুক্ষু,তৃষ্ণার্ত অবসন্ন মুখগুলি
জীবন বাজি রেখে ফিরছে ঘরে
ঘুঘুডাকা গ্রামে, নিজহাাতে ছাওয়া কুটিরে,
আচমকা লকডাউনের জেরে 
এদেশ আজ লাশকাটা ঘর,
যাঁরা মানুুুষের বেঁচে থাকার শর্ত
তাঁরাই  আজ পাশার ঘুঁটি। 
----
ইতিহাস কিছুই ভোলে না,
আজকের অসহায় মুখগুলো
একদিন ইস্পাত কঠিন হবে
আজকের অপমান তাঁরা ফিরিয়ে দেবেই দেবে
হাতের সবল পেশীগুলি মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠবে
ঘুরে দাঁড়াবে, নতুন যাত্রা শুরু হবে
নতুন এক দিনের পথে।

---------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------














  

2 May 2020

প্রবাসী শ্রমিক - ২

প্রবাসী শ্রমিক - ২
****************
  
জয়িতা আর শিখা শিয়ালদহের মোড়ে দেখা করে হ্যারিসন রোড ধরে চলতে শুরু করল, ৭১সালের এক দুপুরে। কথা বলতে বলতে বেশ কিছুটা হাঁটার পর রাস্তায় একটা বেশ সাজান গোছান মিষ্টি / সিঙাড়া / কচুরীর  দোকানে ঢুকল।ভেতর দিকে বসে কিছু খাবার জন্যে সেই ফাঁকে কাগজপত্র আদানপ্রদান আর  কথাবার্তা বলে নেবে বলে। দুটো করে কচুরী/ডাল আর চায়ের অর্ডার দিল।
---
যিনি খাবার দিয়ে গেলেন তিনি ওদের টেবিলের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ছিলেন দেখে ওরা তাঁর সাথে কথা বলতে শুরু করল, কি নাম, দেশ কোথায়, বাড়ীতে কে কে আছে, গ্রামে জমিজমা আছে কিনা, ডিউটি আওয়ার্স কতক্ষন, ক্যাজুয়াল না রেগুলার স্টাফ, কতদিনে বাড়ি যান, মজুরী কত ইত্যাদি। নাম তাঁর গণেশ, চব্বিশ পরগণার মানুষ। কথা হচ্ছিল গণেশদার কাজের ফাঁকে ফাঁকে, অন্যান্য টেবিলে খাবার দেবার সাথে সাথে। আরও বেশীক্ষন বসার জন্য আবার দুটো করে কচুরী, আর চা নিল ওরা। ক্রমে ক্রমে রাজনৈতিক কথাবার্তা বলতে শুরু করে দিল। ভর দুপুর, দোকানে বেশী খরিদ্দার ছিল না। তাছাড়া ওই দোকানে অল্প বয়সী ছেলে মেয়েদের ভীড় বেশী,তারা বসতো অনেকক্ষণ, তাই ওরাও সেদিন প্রায় তিন ঘন্টা কথা বলল। গণেশদার ডিউটি শেষ হতে, ওরাও উঠে পড়ল। আবার দেখা হবে বলে চলে এল।
---
দুদিন বাদে আবার ওরা প্রায় একই সময়ে দোকানটায় গেল গণেশদার সাথে কথা বলার জন্য। সেদিন নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে কিছু বই আর পার্টির কাগজপত্র দিয়ে এল। ঘন্টা তিনেক আগের দিনের মত কথাও  বলতে থাকলো। সেদিন একটা নতুন ঘটনা ঘটল। চারটে করে দুজনে কচুরী খেয়ে দাম দিতে যাওয়ার সময় গণেশ দা মালিককে দুটো করে কচুরীর দাম বললো। এভাবে আরও দুদিন যাবার পর ঠিক হল জয়িতা এখনকার যোগাযোগ রাখবে, দরকার হলে শিখা সাহায্য করবে।
---
মাস দুয়েক যাবার পর গাণেশ দার মাধ্যমে মানিক দা, নির্মল দা, বনমালী, অজিত এই রকম ৫/৬জনের সাথে আলাপ হয়ে গেল। গনেশ দা তাঁদের মধ্যে রীতিমত রাজনৈতিক প্রচার চালিয়ে ৫/৬ জনের একটা ইউনিট তৈরী করে ফেললেন। নিয়মিত দেখা সাক্ষাতের ব্যবস্থা হল। আস্তে আস্তে দোকানের মধ্যে আলোচনার সময় কমিয়ে বাইরে এক এক দিন একজন বা দুজনের সাথে দেখা করে কথা বার্ত্তা হতে লাগল, লোকাল মাস্তান,পুলিশের খোচরদের দৃষ্টি এড়ানোর জন্য। রাতে দোকানের মালিক চলে গেলে একজন ছেলে কমরেডের সেল্টার নেবার ব্যবস্থা হল। ওখানকার শ্রমিকদের মাধ্যমে চব্বিশ পরগনা, মেদিনীপুর, হাওড়া তিনটি জেলায় গ্রামে কমরেডদের যাবার রাস্তা তৈরী হল। তাঁরা হপ্তা শেষ হলে হপ্তার টাকা নিয়ে যখন বাড়ী যেতেন তাঁদের সাথে ছেলেরা চলে যেত, এবং তাঁদের মাধ্যমে গ্রামগুলিতে পার্টি ইউনিট গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালাত।
---
শহরের দোকানের  যোগাযোগ টা মূলতঃ জয়িতা রাখত। গণেশদাদের কথা মত সে সকাল আটটা নাগাদ দোকান খোলার সময় যেত, কারণ তখন মালিক অনুপস্থিত থাকত। তাছাড়া পাড়ার মাস্তান বা খোচরদের আনাগোনা  প্রায় থাকতো না।  রীতিমত ভরপেট কচুরী, নানা মিষ্টি দিয়ে তাঁরা শুধু সকালের কেন প্রায় দুপুরের খাবার খাইয়ে দিতেন, কোন বারণ শুনতেন না। শুধু দুটো কচুরী আর এক কাপ চায়ের দাম দিয়ে চলে আসতে হত। শহরের শ্রমিক অঞ্চলে তাঁরা মাঝে মধ্যে ৫/৬ জনের সাথে বসার ব্যবস্থা করতেন। বছর দুয়েকের মধ্যে একই সাথে ওখানকার শ্রমিকরা গ্রাম আর শহরে পার্টির কাজ চালাতে শুরু করেছিলেন। তাঁরা বেশীর ভাগ ই ছিলেন প্রবাসী  শ্রমিক বসত ভিটে ছাড়া কিছুই প্রায় ছিল না, পেটের তাদিদে গ্রাম থেকে শহরে এসেছিলেন কাজের সন্ধানে। সর্বহারা শ্রেণী শেকল ভাঙার লড়াইয়ে এভাবেই ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে।
------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------













,




     










1 May 2020

প্রবাসী শ্রমিক -1

প্রবাসী শ্রমিক - ১
**************
৭০/৭১ এ সল্টলেক তৈরীর কাজ শুরু হয়েছে। একদিন বিকাল ৩টা নাগাদ উল্টোডাঙ্গার বাজারের সামনে দিয়ে ভূমি  যাচ্ছিল, সামনে একজন মজদুর মাথায় ঝাঁকায় পড়ন্ত বেলার সস্তায় কেনা কিছু তরিতরকারী আর কয়েকটা কাগজের ঠোঙায় কিছু জিনিস পত্র নিয়ে চলেছেন। সে তাঁর পিছু নিল, পার্টির প্রচলিত রীতি মাফিক নতুন নতুন শ্রমিকদের মধ্যে যোগাযোগ আর পার্টির রাজনীতির প্রচার বাড়াতে হবে, সেই উদ্দেশ্যে।
--
তিনি উল্টোডাঙ্গার মোড় পার করে ডানহাতি সল্টলেকে যে নতুন টাউনশিপ গড়ে উঠছে সেদিকে বাঁক নিলেন। সেও রাস্তায় চিন্হ দেখে রাখতে রাখতে তাঁর পেছন পেছন চলতে শুরু করল। চারিদিকে তখন ধূ ধূ বালির মাঠ, মাঝে মাঝে কিছু কিছু বাড়ীঘর, রাস্তা তৈরী চলছে। শীতের বেলাশেষ, বেশ অনেকটা চলার পর তিনি একটা সবে তৈরী হচ্ছে এমন একটা বাড়ির পাশে একটা খাটানো তাঁবুতে ঢুকলেন। একটু অপেক্ষা করার পর ভূমিও গিয়ে তাঁবুর দরজা দিয়ে উঁকি মারলো, কাঁচুমাচু মুখ করে বলল," একটু খাবার জল দেবেন, খুব তেষ্টা পেয়েছে। "
---
"আসুন, আসুন দিদি, এখানে বসুন, জল খাবেন সেটা আর বেশী কথা কি," বলে  দুসারি ইটের ওপর একটা কাঠের তক্তা পেতে বেঞ্চির মত করা আছে, হাতের গামছা দিয়ে ধুলো ঝেড়ে বসতে বললেন একজন বয়স্ক শ্রমিক। " এ আসলাম বেটা, দিদিকে গেলাস ভাল করে ধুয়ে একটু খাবার জল দে বটে। " আসলাম ছেলেটি একটা কলাই করা গ্লাস নিয়ে তাঁবুর পিছন দিকে চলে গেল। সে গ্যাঁট হয়ে বসে কথা শুরু করে দিল, "আপনারা এখানে কতজন আছেন, কোথায় বাড়ী , ইত্যাদি ?"
 ---
বয়স্ক মজদুরটি বললেন, "তা দিদি আমরা জনা কুড়ি আছি, এসেছি ভেন্ন ভেন্ন থান হতে, মর ঘর মেদিনীপুর। মর গাঁয়ের জনা পাঁচেক আছি , এছাড়া বর্ধমান, পুরুলিয়া থেকে জনা চারেক, বিহারের কজনা,উড়িষ্যার কজনা আছি। পেটের দায়ে ঘর ছেড়ে এসেছি কাজ করতি" বলতে বলতে হাঁক পারলেন, "আরে, কুঁয়া খুদে কি জল আনছিস, দ্যাখেন দেখি কি কান্ড, জলের জন্যি পরান টা যায় আপনের !" "আরে না না ব্যস্ত হতে হবে না, আপনার এখানে বেশ হাওয়া দিচ্ছে, গল্প করতে বেশ  লাগছে," মনে ভাবে আরও দেরী করুক না আসলাম, তার তাতে অসুবিধার থেকে সুবিধা বেশী। " তা আপনার  ঘরে কে কে আছে, গাঁয়ে জমিজমা আছে নাকি অন্যের জমিতে জন খাটতে হয়, কদিন বাদে বাদে বাড়ী যান" ইত্যাদি, ইত্যাদি।
---
তিনি হেসে বললেন, "আমার  গ্রামে বউ, ছেলে, মেয়ে, ভাই, বোন সব আছে। জমিজমা নাই, বসত ভিটাখান আছে, আমরা দু ভাই এখানে আসছি, আর দুটা গেরামে জন খাটে। "  আসলাম সদ্য মাজা গ্লাসে জল নিয়ে এল, ইতিমধ্যে প্রায় ১৫জন শ্রমিক ভূমিদের ঘিরে বসে কথা শুনছে। কজন ভিতর দিকে রান্নাবান্নায় ব্যস্ত, কিন্তু কান খাড়া করে কথা শুনছে। জলটা হাতে নিয়ে অল্প অল্প করে চুমুক দিচ্ছে আর কথা চালিয়ে যাচ্ছে। খেয়াল করে দেখলো ওই তাঁবুর মধ্যে নানা জাতি, নানা ধর্মের মিলন। আসলাম, রফিক, ফৈজল, ইমরান এসেছে বিহার থেকে। বৈজু, লক্ষ্মণ, হরিরাম রা এসেছে উড়িষ্যা থেকে। মোহন, সুবল,  মহেশরা এসেছে উত্তরপ্রদেশ থেকে, মুরারি, গণপতি হেমব্রম, শশধর মাহাতো  ইত্যাদিরা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে। বেশির ভাগ ই ভূমিহীন বা দরিদ্র কৃষকের ঘর থেকে এসেছেন। কেউ মাস একবার, কেউ তিন মাসে একবার, কেউ বা ছমাসে একবার বাাড়ি যান, দুরত্ব, মজুরী বা খরচপাতির ওপর নির্ভর করে। বেশীর ভাগই ফুরণে মানে রোজ খাটা মজদুর।
---
জল শেষ হয়ে গেল এবার আর কোন অজুহাতে বসে থাকা যায় না। কিন্তু ভাগ্য সুপ্রসন্ন বয়স্ক শ্রমিকটি যাঁকে সবাই কাকা বলে ডাকছিল, বললেন " দিদি আমাদের গ্লাসে জল যখন খেলেনই , তখন একটু চাও খেয়ে যান ক্যানে। " সে তো এক পায়ে খাড়া। এবার সোজাসুজি রাজনীতির আলোচনা শুরু করে দিল।  দিয়েই বুঝলো কাকা রীতিমত বামপন্থি রাজনীতির সংস্পর্শে এসেছেন, শুধু তাই নয় ভূমিদের পার্টির কিছু নেতার নামও জানেন। চা আসতে আসতে  জোর কদমে রাজনীতি আলোচনা শুরু হয়ে গেল। ততক্ষণে সে তার রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে ব্যাগ থেকে পার্টির বই, কাগজ পত্র বার করে ফেলেছে। চা পর্ব শেষ হতে হতে সাতটা বেজে গেছে। চারিদিক অন্ধকার নেমে এসেছে। সবার মধ্যে এমন উদ্দীপনা দেখে মেয়েটি হতবাক। যা হয় হবে ভেবে কথা চালিয়ে গেল।
---
কাকা রাতের খাবার অনুরোধ করলেন। এক কথায় রাজী, গরম রুটির সাথে পাঁচমেশালি তরকারির ঝোল। খেতে খেতে তাঁদের নানা অভিজ্ঞতা শুনল। রাত প্রায় নয়টা বাজে, মনে মনে প্রমাদ গুনছে , যতই চিন্হ রেখে আসুক কেন, ঘুটঘুটে অন্ধকারে একা রাস্তা চিনে ফেরা মুশকিল। মুশকিল আসান কাকাই প্রথম বললেন, "যা রসিক দিদিকে উল্টাডাঙার মোড়ে  ছেড়ে দিয়ে আয় বটে।" পরের দিন বিকালে আবার যাবার আমন্ত্রণ জানালেন। মহা খুশীতে সে  রসিক ভাইয়ের সাথে কথা বলতে বলতে ফিরে চললো।
---
পরদিন ওই অঞ্চল কিছুটা চেনে একজন ছেলে সাথীকে নিয়ে গেল। তারপর মাঝে মাঝেই ওখানে যেতে শুরু করল বই, কাগজপত্র নিয়ে। যথারীতি জল খাওয়া দিয়ে শুরু করে, চা, রুটি তরকারি দিয়ে রাতের খাওয়া সেরে ফিরত। সকলের মধ্যে বিপুল উৎসাহ সৃষ্টি হয়েছিল। এমন কি মাঝে মধ্যে ওখানে রাত ও কাটায়। দুটি কাঠের পাটাতন দিয়ে নিজেদের চাদর পেতে তার জন্য দারুণ শোবার ব্যবস্থা করে দিতেন। মশার প্রচন্ড তান্ডবের মধ্যেই তাঁরা নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়তেন, আর ভূমি সারা রাত মশা মারত আর ঘুমাতে চেষ্টা করত। খেটে খাওয়া মানুষের জীবনের সাথে একাত্ম হওয়ার পার্টির এই  নির্দেশ যে  শ্রেণী সংগ্রামের অংশ নেওয়ার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ন সেটা ভাল করে বুঝতে পেরেছিল। এর কিছুদিন পর ভূমিরা ধরা পড়ে যায়, কিন্তু উর্ব্বর সেই জমিতে পার্টির  মতাদর্শের বীজের থেকে কিছু চারা গাছ গজানোর সম্ভবনা সম্পর্কে গভীর বিশ্বাস নিয়ে।
---------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------












































  

শ্রমিক প্রবাসী।

শ্রমিক প্রবাসী
***********

ইদানিং করোনার প্রভাবে দেশজুড়ে লকডাউনের ফলে চূড়ান্ত দুর্দ্দশাগ্রস্থ প্রবাসী শ্রমিকদের ভিনপ্রদেশে আটকে পরার খবর কাগজে পড়তে পড়তে আমার ৭১/৭২ সালের দুটো অভিজ্ঞতার কথা রোজই খুব মনে হয়। বর্তমানে লেখা-পড়া নিয়ে আমার দীর্ঘ্য দিন ধরে একটা খরা চলছে। তাই জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়ের শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞতাগুলি লিখে ফেলার কাজ আটকে গেছে। যদি পরবর্ত্তী প্রজন্মের কখন কোন কাজে লাগে ভেবে, আজ শ্রমিক দিবসে নিজেকে প্রায় চাবুক মেরে এই অভিজ্ঞতা দুটি লিখতে বসেছি।
__________________________________________________________________________________________

26 Apr 2020

তোরা খা, আমিও খাই



তোরাও খা , আমিও খাই
******************

ছোটবেলায় দিয়াদের পাড়ায় এক মহিলা ছিলেন , যার বাস ছিল  যত্রতত্র। আজ কারো বাড়ীর রোযাকে , কাল কোন পার্কের বেঞ্চে , পরশু কোন রাস্তার গাড়ী বারান্দার তলায় বা  কোন গাছের তলায়।  সম্বল বলতে একটা মাঝারি আকারের পুঁটলি । রোজ সেটা  খুলে গভীর মনোযোগ সহকারে সব একবার বার করত , আবার গুছিয়ে পুঁটলি  বাঁধত। কেউ যদি দেখার জন্য উঁকি দিত তাহলেই হল। তর্বড়িয়ে পুঁটলি বন্ধ করে তেড়ে যেত তার দিকে। বাচ্চারা ভারী  মজা পেতো। সুযোগ পেলেই ক্ষ্যাপাত " ও শৈলী পাগলী তোর পুঁটলিতে কি আছে , দ্যাখানা আমাদের। দেখবি, একদিন তুই ঘুমালে আমরা সব চুরি করে নেব। " স্বাভাবিক ভাবেই সে ক্ষ্যেপে যেত। চুরি যাবার ভয়ে সেটাকে সব  সময় আকঁড়ে ধরে থাকতো , এমনকি  ঘুমের সময়়েও। অন্যথায় সে কিন্তু ভারী শান্ত ,অযথা কাউকে কিছু বলতনা বা করতনা।
--

পুঁটলি টাই তার একমাত্র সম্বল। সেই পুঁটলিতে ছিল ছেঁড়াখোঁড়া একটা গায়ের চাঁদর , এখটা শাড়ি , কিছু ন্যাকড়া কানি,  কাঁচের দুই একটা হাতের চুড়ি , কিছু মরচে পড়া টিনের কৌটা , শিশি বোতল ,কাগজের টুকরা ইত্যাদি। কারো দান করা বা ফেলে দেওয়া। তাতেই সে সন্তুষ্ট। মাথায় একঢাল নোংরা জটা পড়া চুল , গায়ের গোরা রঙ নোংরা আর রোদে পুরে তামাটে। মাঝে মধ্যে রাস্তার কলে স্নান করলে আসল রঙ উঁকিঝুকি মারত সেই তামাটে রঙের ভিতর থেকে। বড় বড় চোখ আর টিকালো নাক। পরিস্কার পরিছন্ন অবস্থায় দেখলে , তাকে  যে কেমন সুন্দর দেখাবে তাই ছিল দিয়া আর তার  বন্ধুদের গবেষনার বিষয়।
--

শৈলী কিন্তু কিছু ব্যাপারে বেশ শৌখিন ছিল।  রঙিন দড়ি পেলে জটাপড়া চুলগুলিকে একসথে বেঁধে রাখত। প্রতিদিন গাছ থেকে কোন ফুল বা কিছু পাতা তার জটায়ে গোঁজা থাকবেই। সকালে কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতো। কাক, পায়রা বা  চড়ুই যে কোন পাখী দেখলেই ভারী খুশী হতো। দোকান থেকে একমুঠো মুড়ি বা ছোলা চেয়ে এনে , ছুড়ে ছুড়ে তাদের খাওনো ছিল তার শখ। চেনা দোকানদারা তাকে একটু স্নেহমেশানো প্রশ্রয় ই দিত।  প্রকৃতি কে উপভোগ করার রোমান্টিকতা প্রবাহিত হতো তার ধমনীর শিরায় শিরায়। অপূর্ব সুক্ষ এক শিল্পীস্বত্তা ছিল হৃদয়ের অন্তস্থলে।
---

বর্ষাকাল ছিল তার খুব প্রিয় -- মেঘের ডাকে সে ময়ূর-ময়ূরীর মতো চঞ্চল হয়ে উঠতো। বৃষ্টিভেজার আনন্দ তার চোখ মুখে ফুটে উঠতো । আর রাস্তায় জল জমলে তো কথাই নেই , শিশুর মতো সরল খিলখিল হাসিতে উছলে উঠতো।  বাচ্চাদের  জলে কাগজের নৌকা ভাসাতে দেখলে, তাদের দলে ভিড়ে যেত।   দিয়ার কাছে বায়না করতো ," এই মেয়ে আমাকে কাগজ দিয়ে নৌকা বানিয়ে দে , আমিও সবার মতো জলে ভাসাবো। দিয়া শৈলীর ছোটখাটো আবদার গুলি পূরণ করার চেষ্টা করতো। কয়েকটা কাগজের নৌকা বানিয়ে দিলো। শৈলী তো মহাখুশী। মনের আনন্দে বাচ্চাদের সঙ্গে জলে নৌকা ভাসানোর খেলায় মেতে উঠলো।
---

মাঝে মাঝে  বিশ্ব জগত ভুলে রাতের  মেঘ মুক্ত খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতো  তন্ময় হয়ে। দিয়া জিজ্ঞাসা করতো -"ও শৈলী , কি দেখছো এত মন দিয়ে।" একগাল হেসে বলতো "দেখছিস না  কত তারা আকাশে।  আচ্ছা  চাঁদ কি ওদের রানী - কত বড় আর কি সুন্দর। নিশ্চই চাঁদ রাতের আকাশের রানী। " "তাহলে , রানীর রাজা কে ,শৈলী। " 'ওমা ,জানোনা বুঝি, ভোরের লাল সূর্য্য টাই ওর রাজা। সোনার  রাজার রূপার রানী।  ঠিক বলেছিনা বলো। " " হ্যা, একদম ঠিক বলেছো। " ব্যাস মহাখুশী শৈলী।
--

আর একটা অদ্ভূত মজার ব্যাপার ছিলো শৈলীর। ক্ষিদে পেলে সে সোজা  বাগানের গেট খুলে বাড়ীর দরোজাতে এসে স্বাভাবিক অধিকারবোধে  হাঁক পাড়তো - "কইরে , আমার ক্ষিদে পেয়েছে ক্ষেতে দে। তোরাও খা , আমিও খাই। " কেউ যদি বলতো " তোমাকে কেন দেবো ?"  "কেন দিবি না ! তোরা খাবি  আর আমি খাবোনা কেন ! তোরাও খা , আমিও খাই। "
তবে শেলী বুঝে গেছিলো কোথায় খাবার পাবে আর কোথায় পাবেনা। যেখানে তাকে স্নেহভরে খেতে দেবে সেখানেই সে সাধারনত যেতো।  কিন্তু  মুশকিল হলো, কোথাও মাথায় দেবার ফুল /পাতা না পেলে সে লোকের বাড়ীর বাগান থেকে নেবে। বারণ করলে , বলবে, " এই  মাটিতে গাছ হলে সেটা সবাইয়ের। তোদের যেমন ,আমারও তেমন। তোরা জন্মের সময়ে মাটি কি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিস ?"  সাধারণত সে কখনোই একই বাড়ীতে সাত/দশ দিনে একবারের বেশী   যেতো না । ঘুরে ফিরে বিভিন্ন পাড়ায় বিভিন্ন বাড়ীতে যেতো। সমতাবোধ ছিল তার মজ্জাগত।
---

একদিন দিয়া তাকে জিজ্ঞাস করলো ," কি হলো , এতদিন পরে এলেযে ? কোথায় ছিলে ?" " অন্য পাড়ায় গেছিলাম , অন্য অনেক বাড়ী বাড়ী ঘুরছিলাম। " কেন ! এ পাড়ায় তোমাকে কেউ কিছু বলেছে ?" " ধূর বোকা মেয়ে , যেখানে আমকে ভালবাসে না , সে সব বাড়ীতে আমি কখনো যাইনা , আমার কি কোন মান নেই ! তবে হ্যা রোজ রোজ এক বাড়ীতে গেলে তাদের ওপর চাপ হবে না , অন্যায্য হবে না ! তাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গেলে কারোর গায়ে লাগবেনা। আর রোজ তোকেই বা শুধু কেন জালাবো ! বাকীরা ও তো নিজেরা খাচ্ছে , তাহলে আমাকেই বা খেতে দেবেনা কেন ?" অকাট্য যুক্তি। "তবে হ্যা , তুই  আমার সবচেয়ে ভাল মা, শোন আমি মরলে এই পুঁটলি টা তোকে ই দিয়ে যাবো। এই দ্যাখ আমার এই লাল চুড়ি দুটো পরবি। পরবি তো  ?" কি ব্যাকুলতা যে ছিল সেই প্রশ্নে। অত গভীর ভালবাসা কে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
__

এরপর বেশ কদিন কেটে গেলো শৈলী আসে না। দিয়ার মনে মনে একটা অশ্বাস্তি বোধ হতে লাগলো। স্কুল যাওয়া আসার পথে দিয়ার  দুচোখ তাকে খুঁজে বেড়াতে লাগলো। কিন্তু কোথাও তাকে দেখতে পায়না। শেষে এক শনিবার বিকালে বন্ধুরা দল বেঁধে তাকে খুঁজতে বার হলো । অবশেষে তার দেখা মিললো। এক বড় বাড়ীর গাড়ী বারান্দার তলায় তাকে আবিস্কার করা গেল , প্রচন্ড জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে , কাশতে কাশতে দম বন্ধ হবার যোগাড় । দিয়াদের  দেখে এক চিলতে হাসি ফুটলো তার মুখে, কিন্তু কথা বলার শক্তি নেই।   আশপাশের দোকানদার রাই খাবার দাবার দিচ্ছিলো। পাড়ার এক ডাক্তার বাবু ওষুধ দিয়েছেন।
--

তখন মাঘ মাসের ঠান্ডায় ঘরে লেপ মুড়ি দিয়েও  সবাই  যখন কাঁপছে, খোলা জায়গায় শৈলীর জ্বৰ বেড়েই চললো, আস্তে আস্তে সজ্ঞাহীন হয়ে পড়লো। ডাক্তার বাবুর কথায় পাড়ার লোকজন সরকারি  হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়ে আসলো। দিন তিনেক বাদে শোনা গেলো শৈলী মারা গেছে। দাহ করার দায়িত্ব নেবার কেউ ছিল না , তাই বেওয়ারিশ লাশ হিসাবে তার শেষ আশ্রয় জুটলো লাশঘরে।
---

পাড়ার অনেকের ই  মন খারপ,  শৈলী যে সকলের অজান্তে তাদের জীবনের একটা অঙ্গ বা অভ্যাস হয়ে দাড়িয়ে ছিল।  একদিন এক দোকানদার দিয়ার  হাতে শৈলীর লাল চুড়ি দুটি দিয়ে বললো ," দিদি শৈলী বারবার করে এটা তোমাকে দিতে বলে গেছে। "  অনেকদিনের জমানো চোখের জল আর বাঁধ মানলো না। খালি মনে পড়তে থাকে, " এই খেতে দে,  ক্ষিদে পেযেছে। তোরাও  খা , আমিও খাই। " একটা অতি  সাধারণ মানুষ, লোকে যাকে পাগল বলত , কত সহজ, সরল ভাষায়  জীবনের সবচেয়ে গভীর সত্যটাকে  বলে গেছে। 
-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------