3 Feb 2016

অনুভব

অনুভব
*****

কাকভোরে কল্লোলীনি কলকাতায়,
কোকিলের কূহুতান, কোয়েলের কলরব কোথায় !
কাকেদের কর্কশ কা কা, কাঠঠোকরার কিট কিট , 
কুমারীদের কাজল কাল কোকঁড়া কেশের কারুকাজ,
কচিকাঁচাদের কাকলি, কৈশোরের কলতান কোথায় !
--
বেলা বাড়ে, বাজারে ব্যস্ত বাবুরা
বাড়িতে বউঝিদের বাদানুবাদ,
বাটি বাসনের বোঝা, বাউটি বালার ব্যঞ্জনা,
বাসযাত্রীদের ব্যস্ততা, বদ্ধ বাস্তবতা
বেদনার বাঁশী বাজায় বাউল বাতাস।
--
সন্ধ্যা সেজেছে স্বর্ণসিঁদুরে, 
সুপ্ত সূর্য্য সুদূর সরোবরে,
স্নান সমাপনে সিক্ত সাঁঝলি, 
সাথীর সাদর স্বপ্নে সম্মোহিত,
সমুদ্র সফেনে সূর্য্য সমর্পিত।
-------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------






30 Jan 2016

মহাজাগর

মহাজাগর  
*******
আমাদের পরিচয় মানুষ, 
মানবিকতাই যার ধর্ম।
সকলেরই শরীরে প্রবাহিত
যে রক্ত লাল তার বর্ণ
আদিম কাল থেকে বিবর্তনের
লব্ধ জ্ঞানই আমাদের গর্ব।  
--
সকলের ক্ষুধার অন্ন
মাঠ ভরা সোনার ফসল। 
পরণের মোটা কাপড়,
শীত, গ্রীষ্ম, জল। 
সরল জীবন, সৃষ্টির সুখ,
রোপিত হবে কত ফুল, কত ফল।
--
বারুদের গন্ধ নয়, নির্মল বাতাস,
ভেজা আকাশে সাতরঙা রামধনু।
রক্ত নয়, ঘাসের ডগায়,
ভোরের মুক্তঝরা শিশির বিন্দু।
হিংসা নয়, বিদ্বেষ নয়,
বইবে ভালবাসার সিন্ধু।
--
আমদের সকলের বাস,
একটি মাত্র গ্রহে।
পৃথিবী তার নাম,
স্থান বিশ্ব ব্রম্ভান্ডে।
মাটির এই ধরনীতে যখন আসবে মহাজাগর,
মহামিলন ঘটবে সেই মহালগ্নে। 
--
সেই আমাদের একমাত্র স্বপ্ন,
একটি মাত্র আশা। 
সেই আমাদের পরম সুখ,
আজীবনের প্রত্যাশা।
যেদিন বাজবে সে মহাডঙ্কা,
জাগবে জীবনের প্রতি অকৃত্তিম ভালবাসা। 

-------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------














27 Jan 2016

বহেনজী ভাগ গই


বহেনজী ভাগ গই
************
  
মুক্তি আর স্মৃতি দুই বান্ধবী ইডেনগার্ডেন সামনে দেখা করল, দুজনেরই সঙ্গে দুটি ডাউস হ্যান্ড ব্যাগ। ১৯৭২ সালের জানুয়ারী মাস। বেলা ১/২ টো হবে। বেশ কনকনে ঠান্ডা বাতাস। কিন্তু কারো গায়েই গরম জামা কাপড় নেই, পরনে নেহাৎ আটপৌরে শাড়ি। মোটের উপর সাদাসিদে বেশবাস। দুই বন্ধুই একটি রাজনৈতিক পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী। সেই সংক্রান্ত কথাবার্তা বলা ও পার্টির কাগজ পত্র আদান প্রদানের জন্য দেখা করেছিল। ভেবেছিল লোকে ভাববে হয়ত দুই বান্ধবী কলেজ ছুটির পর শীতের দুপুর টা উপভোগ করতে এসেছে।
--

ব্যাপার ঠিকঠাক চলছিল। অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাবেই কাগজ পত্র আদান প্রদান করা হয়ে গেল। কথাবার্তাও চলছিল গল্পের ভঙ্গীতে। চারপাশে সতর্ক দৃষ্টি রেখেছিল দু জনেই। হটাত মুক্তি বলে, "পিছনে তাকাস না, একটা লোক আমাদের বেশ কিছক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছে। ভাব গতিক টা সন্দেহ জনক।" দুজনে বিষয় বদলে মজার গল্প করতে করতে উঠে দাঁড়াল। এবার স্মৃতি ও লোকটাকে দেখে নিয়েছে। লোকটাকে নজর রাখতে রাখতে, হাসি মজা করতে করতে হাঁটতে শুরু করল। লোকটা তাদের পিছু পিছু চলতে থাকে।
--

অনেক ক্ষণ গার্ডেনের এদিক ওদিক হাঁটার পরও লোকটা তাদের পিছু ছাড়ে না। এখানে ওখানে অনেক লোকজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে গল্প গুজব করছে। একটি জায়গায় এক স্বামী স্ত্রী নিজেদের তিনটি বাচ্চাকে খেলাছিল। দুই বন্ধু তাদের কাছে গিয়ে বসে পড়ে। তারপর বাচ্চাগুলির সাথে খেলতে শুরু করে।
--

লোকটি কিন্তু তাদের পিছনেই একটি বেঞ্চে বসে নজর রাখতে থাকে। তারা উঠে দাঁড়াবার সাথে সাথে সে ও উঠে পিছু নেয়। এবার মুক্তি আর স্মৃতি বেশ চড়া গলায় বলে," কি ব্যাপার বলুন তো, তখন থেকে আমাদের পিছু নিয়েছেন কেন? আপনার মতলব টা কি ?"
--

চার পাশ থেকে লোকজন উঠে আসে, "কি হয়েছে দিদি ? কি, মশাই, ওনাদের পেছনে লেগেছেন কেন ?" লোকটি বেগতিক দেখে পকেট থেকে পুলিশের আই ডি কার্ড বার করে, বলে," আরে দাদা, আভি দিন কাল বহুত খারাব হ্যায়। অভ বাজে লড়কীয়া খরিদ্বার কে লিয়ে আসে।" "আমাদের কি আপনি তাই ভেবেছেন ! কলেজ ছুটি হয়ে গেছে তাই আমরা এখানে বেড়াতে এসেছি", জোর গলায় প্রতিবাদ করে দুজন, যদিও ভেতরে ভেতরে পুলিশের আইডেনটিটি কার্ডটা দেখে প্রমাদ গোনে। শেষে কেঁচো খুড়তে সাপ না বেরিয়ে পড়ে। দুজনের ব্যাগেই ভর্তি পার্টির জরুরী কাগজ পত্র।
 --

চার পাশের লোকজন ওদের পক্ষেই  কথা বলছিল,"থাক দাদা আর বড়াই করবেন না, আপনাদের কাজই সাধারণ মানুষদের হয়রানি করা। যান যান নিজের কাজে যান।" দুই বন্ধু সবাই কে ধন্যবাদ দিয়ে তাড়াতাড়ি পা বাড়ায়। ভীড় পার হতেই ওদের পিছন পিছন লোকটা আবার হাঁটতে থাকে। দুজনে নিজেদের মধ্যে কথা বলে নেয়, "ভাগ্যে আমাদের রাজনৈতিক কর্মী বলে সন্দেহ করেনি। ভয় দেখিয়ে ধান্ধা করার চেষ্টা করছে। বুদ্ধি করে এর হাত থেকে ছাড়া পেতে হবে।"
--

ওরা দাঁড়িয়ে যায়, মোলায়েম গলায় বলে, "কি ভাইয়া আবার কি হলো। আপনার বোনেরা কি বন্ধুদের সাথে বেড়াতে যায় না। আমরা তো আপনার বোনের মত, ভাই হয়ে এই রকম পিছু নেওয়া কি শোভন দেখায়। তাকিয়ে দেখুন, ওই ছেলেরা কিন্তু এখনো লক্ষ্য করছে। এখানে রাস্তার মাঝে এসে যদি আবার আপনাকে ঘিরে ধরে তাহলে ভাল হবে। তার থেকে আপনি আপনার কাজে যান। আমাদেরও বাড়ি যেতে হবে। চলি ভাইয়া, আবার পরে একদিন দেখা হবে।" লোকটি কি ভেবে পিছন দিকে হাঁটতে শুরু করে। মুক্তি আর স্মৃতি উল্টো ফুটপাতে বাস স্ট্যান্ডের দিকে রওনা হয়।
--

একটু যাওয়ার পরই হটাত পেছন থেকে ডাক শোনা যায়,"বহেনজী, বহেনজী, শুনিয়ে।" শুনতে না পাবার ভান করে ওরা জোরে পা চালায়। কাকস্য পরিবেদনা। পিছন পিছন আওয়াজ আসতেই থাকে, "বহেনজী শুনিয়ে না, ঠ্যারিইয়ে না।" আর এড়ানো যাবেনা বুঝে ওরা দাঁড়িয়ে যায়,"আবার কি ভাইয়া, আমাদের তো দেরী হয়ে যাচ্ছে। কাল কলেজ আছে। বাড়ি ফিরে পড়তে হবে।" "আপলোগনে মুঝে ভাইয়া বোলা। মেরা ফর্জ হ্যায় আপলোগ কো কুছ খিলানা।""না, না, আমাদের একদম খিদে নেই। কিছু খাওয়াতে হবে না।" কিন্তু সে যে 'পাগলারে সাঁকো নাড়াস না' র অবস্থা। বহেনজীদের না খাইয়ে সে কিছুতেই ছাড়বে না। আসল মত্লব  বোঝা দুষ্কর। যেন তেন প্রকারেন তারা পালাতে পারলে বাঁচে।
--

কিছুক্ষণ কালক্ষেপণের পর রফা হলো বাস স্ট্যান্ডের কাছাকাছি কোল্ড ড্রিংকের স্টল থেকে কোকাকলা খাওয়া হবে। স্মৃতি আর মুক্তি পরস্পর কে ইশারা করে প্ল্যান ঠিক করে ফেলে। যত তাড়া তাড়ি সম্ভব চো  চো করে দুজন নিজেদের বোতল গুলি খালি করে ফেলে। পুলিশ ভাইয়া ততক্ষণে পকেট থেকে একশ টাকার নোট্ বার করে দিয়ে, সবেমাত্র নিজের বোতলে সিপ্ করতে শুরু করেছে। এদিকে একটা বাস  বাসস্ট্যান্ডের  মুখ থেকে ঘুরতে শুরু করছে। কোনমতে বোতল দুটি নামিয়ে দিয়ে দুজনে দৌড়ে গিয়ে লাফ দিয়ে চলন্ত বাসে উঠে পড়ে। ভাইয়া হটাত খেয়াল করে বহেনজিরা বাসে উঠে পড়েছে।
--

প্রথমে সে হতভম্ব হয়ে পড়ে। কি করেবে ভেবে পায় না - নিজের কোকাকোলা খাবে, না টাকার বাকি খুচরো টা আদায় করবে, না বাসে উঠবে। চীত্কার করে গালি গালাজ করতে থাকে, "এ বাস, রোককে রোককে, এই শূয়ার কা অউলাদ...... জলদি মেরে ছুট্টা দো।  এ শালে .... কন্ডাক্টার বাস রোক না।..... বহেজিলোগ ভাগ রহি হ্যায়।" মুক্তিদের ইশারায় কন্ডাক্টার কি বুঝলেন কে যানে। হেসে জোরে জোরে ঘণ্টি বাজিয়ে দিলেন। ড্রাইভার ও ফুল স্পিডে বাস চালিয়ে দিলেন।
--

পুলিশ ভাইয়ার ওদের দিকে তাকিয়ে রাগে বিড় বিড় করে কি সব বকতে থাকে। ভাব দেখে মনে হচ্ছিল,'জল থেকে আগুনে পড়বে, না আগুন থেকে জলে পড়বে',ঠিক করতে পারছেনা । প্রথমে স্মৃতিদের দের নিজেদের অভদ্রতায় একটু খারাপ লাগছিল। কিন্তু ভাইয়াজির চেহারার ভাব গতিক দেখে বুঝতে পারল আজ তাদের একটা বড় বিপদ কাটল। তারপর ৪/৫ বার বাস বদল করে, অনেক রাস্তা ঘুরে ফিরে নিজেদের গন্তব্যে গেল।
__________________________________________________________________________________________



























  

































24 Jan 2016

খরা - 2

খরা
***
জীবনে চলার পথে পথে
অনিশ্চয়তার বাঁকে বাঁকে,
মনের দুর্বলতার ফোকর
গলে, খরার বান ডাকে।
--

কে জানে কোন সুদূরে,
আবেগ রা যায় ভেসে, 
ভাবনা গুলি হারিয়ে যায়
গহন অন্ধকার আকাশে।
--

ভোরের বাতাসের শব্দ
জাগায় না শিহরণ,
সাগরের দুরন্ত হিল্লোল
তোলে না আলোড়ন।
--

জোত্স্নার গন্ধ
ছড়ায় না পুলক,
কোথায় তারাদের  
ঝিলিমিলি ঝলক!
--

শিশির ভেজা মাটি,
আজ যেন শুষ্ক ফুটিফাটা,
দাঁড়িয়ে পাতাঝরা গাছেদের কঙ্কাল
নেই সবুজের ছিটেফোঁটা। 
 --

কল্পনারা পাখনা মেলেনা
চারিধারে ঘোর অমানিশা,
কবে হাসবে নতুন সূর্য
দেখাবে নতুন পথের দিশা।
--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------













7 Jan 2016

একা চাঁদ কাঁদে

একা চাঁদ কাঁদে
**********
সাথী হারা চাঁদ আজ একা কাঁদে আকাশে,
তারাদের খোঁজে ভেসে বেড়ায় মেঘের সাগরে
বিরহে ঝাঁপিয়ে পড়ে পৃথিবীর কোলে অবশেষে,
বিশাল সাগরে উন্মত্ত ঢেউয়ের দল সাদরে 
বরণ করে নেয় তারে, আনন্দে ভালবেসে।
--
বেলাভূমিতে আছড়ে পড়ে তরঙ্গের তালে তালে
তারই টানে আবার ফিরে যায় গভীর সাগর জলে
প্রহরের পর প্রহর কাটে, উল্লসিত চাঁদের খেলা চলে,
দূর থেকে দূরান্তে ভেসে যায়, গভীর থেকে গভীরতর জলে
শান্ত সমাহিত সমুদ্রে তারাদের আবার খোঁজ মেলে।
--
অভিমানী চাঁদ অবাক বিস্ময়ে চায় চির সাথীদের দিকে
ঝিকি মিকি তারাদের দল যেন হাসে তাকে ঘিরে ধরে
মেতে ওঠে ধুসর মাটি, দিগন্তে বাতাস দোলা দিয়ে যায় বনানীকে,    
প্রকৃতি জানে সময় আগত, জেগে ওঠে আকাশ মাথার উপরে
সূর্য্য আরও একটা নতুন দিনের আলো উপহার দেয় পৃথিবীকে।
-------------------------------------------------------------------
----------------------------------------------------------


















4 Jan 2016

একাকিত্ব

একাকিত্ব
******

আমরা সকলে একটি বাড়ীতে থাকি,
প্রতিটি ঘর যেন এক একটা বিছিন্ন সত্তা।
আমরা সবাই একই পাড়ার পড়শি,
কারোর মুখ কেউ ঠিক ঠাক চিনিনা।
আমরা অনেকে একই জেলার অধিবাসী,
কেউ কাউকে আপন ভাবি না।
আমরা প্রায় চার কোটি একই প্রদেশে থাকি, 
কিন্তু একে অপরের যাপন বুঝিনা। 
আমরা শত কোটির দেশ,
এক প্রান্তের লোক অপর প্রান্তে বিদেশী।
আমরা কত সহস্র কোটি একই মহাদেশে বসত করি
সদাই একে অন্যের বিরুধ্বে অস্ত্র শানাই। 
আমরা একই গ্রহের মানুষ
মনুষ্যত্ব কে দাসত্বের শেকলে বেঁধে, যেন এক একটা বিছিন্ন দ্বীপ।
-------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------





10 Dec 2015

ভার

ভার
***

বৃষ্টির বাবা মারা যান ১৯৭১ সালে। সেই রাতের ছবিটা এখনও তার পরিষ্কার মনে আছে। বাবা বেশ কিছুদিন ধরে ভুগছিলেন। সেদিন শরীর টা সকাল থেকেই খারাপ ছিল। ডাক্তারবাবু মোটামুটি ওকে বলেই গেছিলেন, "আর টানাহ্যাচড়া করে লাভ নেই, শেষ সময়টা শান্তিতে পরিবারের সাথে থাকাই কাম্য।" একমাস আগেই হাসপাতাল থেকে এই কথা বলেই ছুটি দিয়েছিল। তবু একটা মাস বাবার যত্ন করেতে তো পেরেছে বৃষ্টি।
--
মা তো তার কবেই চলে গেছেন। বাবা দুজনের স্নেহ দিয়ে তাকে বড় করেছেন। দাদা দিদিদের থেকে বয়সে সে অনেকটা ছোট। তাদের স্নেহও যথেষ্ট পেয়েছে। বাবা সবাই কেই খুবই স্নেহ/ভালবাসা দিয়ে মানুষ করেছেন। প্রচুর পরিশ্রম করতেন। নামী এডভোকেট ছিলেন। আয় যথেষ্ট ছিল। কার কোন অভাব হতে দেননি সাধ্যমত। দাদা দিদিরা সবাই কৃতি ছাত্র/ছাত্রী ছিলেন। এখন সবাই ভালভাবে প্রতিষ্ঠিত, ভাল আয়।
--
একমাত্র বৃষ্টি এখন ইউনিভার্সিটির ছাত্রী,পড়াশুনায় ভাল। বাবা তাকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে না যেতে পারার দুশ্চিন্তায় ভুগতেন, তাঁর হাতে যে বেশী সময় নেই বুঝতে পেরেছিলেন। বৃষ্টির ঠাকুরদাদাও নামী এডভোকেট ছিলেন, বাবা তাঁর একমাত্র সন্তান। লেকের কাছে এক বিশাল বাড়ী করেছিলেন, নাতি/নাতিনীদের কথা ভেবে। বলা যায় বৃষ্টিরা যথেষ্ট স্বচ্ছল পারিবার।
--
বাবা বাড়ী আসার পর থেকে বৃষ্টি একাই আয়া মাসীদের সাহায্যে তাঁকে দেখাশুনা করত। নিজেই বাবাকে খাবার বা ওষুধ খাওয়াত, স্নান থেকে শুরু করে সব কিছু তার তত্বাবধানে হত। ইউনিভার্সিটি যাওয়া হত না। বাবা রাগ করতেন,"তুই আজও বাড়ী বসে আমার সেবা করবি,পড়াশুনা কি ছেড়ে দিলি? তোকেও কিন্তু ভাল রেজাল্ট করতে হবে।" " কদিন বাবার সেবা করলেই যদি রেজাল্ট ভাল না হয়, তবে সে পড়াশুনার দরকার কি?"
--
কিন্তু এই সময় টা ছেলেমেয়েদের একটু সান্নিধ্য মনে মনে আশা করতেন, যদিও মুখে কখনও প্রকাশ করেননি। তাঁর চার ছেলে /বৌ, বাকি দুই মেয়ে/জামাই, নাতি/নাতনি একই বাড়ীতে উপর তলায় থাকে। ইচ্ছে করলে পালা করে একটু সময় তাঁর সাথে অনায়াসে কাটাতে পারত। বৃষ্টি ই তাঁর অগতির গতি, দেখভাল ছাড়াও বাবাকে কাগজ/বই পড়ে শোনাত, গল্প করত। তিনি ঘুমালে তাঁর ঘরে বসেই নিজের পড়াশুনা করত।
--
সেদিন বিকাল গড়িয়ে গেলে বাবা মারা গেলেন। ডাক্তারবাবু ডেথ সার্টিফিকেট লিখে দিয়ে দিলেন। দিদি দাদারা একেবারে তাদের পরিবার সমেত এক তলায় বাবার ঘরে হাজির। তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে। এদিকে সারা অঞ্চল পুলিশ/মিলিটারি ঘিরে ফেলেছে। সমস্ত পাড়ায় চিরুনী তল্লাশী শুরু হল, ধরপাকড় চলল প্রায় রাত ১২/১ পর্য্যন্ত। বেশ কয়েক রাউন্ড গুলির আওয়াজ পাওয়া গেল।
--     
বৃষ্টি দের বাড়ীতে তখন অদ্ভূত এক পরিবেশ। বাবার মৃত দেহের সামনে ঘন্টাখানেক একটু কাঁদার পরই দাদা, দিদি, বৌদি, জামাইবাবুরা সবাই মিলে তন্ন তন্ন করে বাবার আলমারির চাবি খুঁজতে শুরু করল। উইল, কাগজ পত্র, মায়ের গয়না আর টাকাকড়ি  সব সেখানেই থাকত কিনা। এদিকে মৃতদেহের সামনে বৃষ্টি অঝোরে কেঁদে যাচ্ছে। একটু ইতস্তত করে বড়দা তাকে বলল,"কাঁদিস না বোন, বাবার সময় হয়েছে চলে গেছেন। আমরাই তোর দেখভাল করব। বাবার চাবিটা কোথায় বলত।"
--
বৃষ্টি অবাক চোখে তাকায়,"বাবার চাবি ! এখন কি করবে চাবি দিয়ে!" "না মানে বাবার উইল, মায়ের গয়না, কাগজপত্র সব বার করতে হবেত", দাদার উত্তর। "কিন্তু এখন সেগুলি বার করতে হবে কেন!"- বৃষ্টির বিস্ময় কাটে না। মেজদি বলে,"বাঃ! বাবা কি রেখে গেছেন, কাকে কি দিয়ে গেছেন, দেখতে হবেনা " বৃষ্টি বলে,"এখনি দেখতে হবেই বা কেন!" বড়দি আমতা আমতা করে বলে,"আসলে সে সব ঠিক মত সবার মধ্যে ভাগ করতে হবেত।" " কিন্তু বড়দি,সেটা ত পালিয়ে যাবেনা। বাবার মৃতদেহ এখনও বাড়ীতে। দাহ হয়নি, আর এখনই  ভাগ বাটোয়ারা করতে হবে। দু /এক দিন পরে করা যাবেনা! আশ্চর্য্য! লোকে শুনলে কি বলবে!"
--
এবার হাল ধরলেন মেজদা,"বেশী পাকামী করো না! কোন লোক আছে এখানে, আমাদেরের একান্ত নিজেদের জন ছাড়া। আর এই গণ্ডগোলের মধ্যে মৃতদেহ নিয়ে তো বেরনো যাবে না, তাহলে আসল কাজ সেরে ফেলতে বাধা কোথায়।" এরপর কথা বাড়াতে বৃষ্টির প্রবৃত্তি হল না,"দ্যাখো, বাবার বিছানার গদির নীচে আছে!" "না না, বাকী বিছানা তো আমরা দেখেছি। বাকি শুধু....,বৌদির অসমাপ্ত কথা টা বৃষ্টি বুঝল, নীরবে বাবার বালিশের পাশ থেকে উঠে দাঁড়াল। সাথে সাথে গোটা দশেক হাত ঝাঁপিয়ে পড়ল।
--
ভোর রাতে, বাবাকে দাহ করে ফিরে এসে বৃষ্টি অবসন্নের মত তাঁর বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। বেলা আটটায় ঘুম ভাঙলে, চারিদিকে তাকিয়ে মনে হল যেন দক্ষ যজ্ঞ হয়ে গেছে সে ঘরে। উঠে চোখ মুখে জল দিয়ে ভাল করে ঘরটা গুছাল, পরিষ্কার করল।বিছানার চাদর, বালিশের ওয়ার, টেবিলের ঢাকনা সব বদলালো। বাবার আরাম কেদারার কাছে তাঁর হাতে পোতা একটা ফুলের টব রাখল। অনেক ফুল দিয়ে ঘরটা সাজিয়ে, দেয়ালে টাঙানো বাবা আর মার বড় ছবি দুটিতে  মালা দিয়ে ধূপ জ্বালিয়ে দিল।
--
স্নান সেরে, জামা কাপড় বদলে, বাবার ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল। 'এঘরে এখন আর কারো দরকার পড়বে না। সবার প্রয়োজন তো কাল রাতেই মিটে গেছে' - একথা ভাবতে ভাবতে প্রিয় বান্ধবীর বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওনা দিল। সেটা তাদের বাড়ী থেকে বেশ কিছু টা দূরে। যেতে যেতে মনে হল সারা পাড়ায় যেন শ্মশানের স্তব্ধতা। দোকান পাট বন্ধ, লোকজন খুব কম। যারা বাইরে বেরিয়েছে তাদের দেখে মনে হচ্ছে যেন কোন অদৃশ্য দুঃখের ঝড়ে ভেঙে পড়ছে, মুখ গভীর শোকে বিহ্বল। বাচ্চারাও যেন কাঁদতে ভুলে গেছে। বৃষ্টির মনে হল কোন ভয়ংকর দুঃস্বপ্নে আছন্ন সমস্ত এলাকা। 
--
বান্ধবীর বাড়ীর গিয়ে দেখে তারাও শোকে মুহ্যমান। "বৃষ্টি, শুনেছি তোর বাবা কাল মারা গেছেন, কালই যাব ভাবেছিলাম। কিন্তু পাড়ায় যে অবস্থা যেতে পারিনি, কিছু মনে করিস নিত। আজ যেতাম, তা তুই এত সকালে বাড়ী  থেকে বেরিয়েছিস?" "সে অনেক কথা পরে বলব, এখন মন ভাল লাগছেনা।" "আমাদেরও আজ খুব মন খারাপ। শুধু আমাদের কেন সারা পাড়ায়, না সারা বেলেঘাটাতেই আজ শোকের দিন।" "হ্যা, এতটা রাস্তা আসলাম, মনে হচ্ছিল কি একটা মারত্মক কিছু ঘটেছে। তোদের বাড়ীরও সবাই শোকগ্রস্ত বোঝাই যাচ্ছে। কি হয়েছে রে?"বৃষ্টি জানতে চায়।    
--
"জানিস  কাল পাড়ার চারটে অল্প বয়সী ছেলেকে গুলি করে মেরে লেকের ধারে ফেলে দিয়ে গেছে।" বৃষ্টি জিজ্ঞাসা করে, "সেকি, কেন !" "ওরা যে এই সমাজ ব্যবস্থা কে পাল্টাতে চেয়েছিল।" "মানে?" "মানে,ওরা নতুন মানুষ হতে চেয়েছিল। নতুন একটা সুন্দর সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল।" তারপর দুই বন্ধু চুপচাপ। মুখে কারও কোন কথা নেই, কিন্তু মনের মধ্যে যেন উথল পাতাল ঢেউ আছড়ে পড়ছে।
--
বৃষ্টি বিরাট এক প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে," আচ্ছা আমাদের বাবা যে ছেলেমেয়েদের কে প্রাণপাত করে মানুষ করেছেন , তাঁর মৃত্যু তাদের মধ্যে কোন দাগ ই রেখ গেল না। অথচ এই ছেলেগুলির জন্যে সমস্ত এলাকা শোকস্তব্ধ। তাদের মৃত্যু অনাত্মীয় মানুষের বুকে কি বিশাল ভার চাপিয়ে দিয়েছে, কেন !" উত্তর এল," ওরা যে সূর্য্য ধরতে চেয়েছিল।"
-------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------