29 Jun 2026

" আমাদের জয়া রোদ্দুর হতে  চেয়েছিল "

*******************************

আমাদের জয়া মানে  কৃষ্ণা  বন্দ্যোপাধ্যায়  এর সাথে আমার পরিচয় প্রেসিডেন্সি জেলে। তখন আমরা  জনা আট / নয়  ভেতরে। বাম রাজনীতির প্রভাব ওদের পরিবারে ছিল। নকশাল বাড়ী ঘটার আগে বাম প্রার্থীদের হয়ে প্রক্সি ভোট দিতে গিয়ে পরিচিত পাড়াতুত জ্যাঠা /কাকাদের হাতে পড়তে পড়তে পালিয়ে আসে, তার কিছু মজার গল্প আমরা শুনেছি। খুব সম্ভব কলেজ পাশ করার পর নকশাল বাড়ী ঘটে। ও অমর শহীদ  দ্রোণাচার্য্যদের  সাথে  সি পি আই এম এল পার্টির সাথে  যুক্ত হয়। ধরা পড়ার আগে পর্যন্ত পার্টির একনিষ্ঠ কর্মী ছিল। 

আমাদের জয়ার রাজনৈতিক জীবন নিয়ে অনেকেই লিখেছেন। আমি তাই আমাদের কিছু ঘনিষ্ট সময় ও ওঁর একান্ত ব্যক্তিগত গুণগুলি কে তুলে ধরতে চাই। জয়ার গানের গলা ছিল খুব সুন্দর। মিষ্টতার সাথে দৃঢ়তার মিশ্রণ। তাছাড়া অভিনয় ও পাঠ ইত্যাদি তে দারুণ দক্ষ ছিল। পরিষ্কার ভাবে নিজের  বক্তব্য রাখতে পারদর্শী, কোন মিটিং বা প্রোগ্রাম পরিচালনা তে অসম্ভব দক্ষ ছিল। অসাধারন দখল ছিল সাহিত্য সৃষ্টিতে। ঝরঝরে, সুললিত ভাষায়  দক্ষতার সাথে যে কোন ধরনের লেখা লিখতে পারত। তাই ইচ্ছা করলেই ও ভাল কন্ঠ শিল্পী, অভিনেত্রী বা বাচিক শিল্পী হতে পারত, ভাল সাহিত্যিক হতে পারত। কিন্তু রাজনীতি টাই ওর শিরায় শিয়ায় বইত।      

আর একটি গুণ ছিল জয়ার, সুক্ষ রসবোধ। মহাদেব মুখার্জীর অধঃপতনের পর পার্টি দুভাগ হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ সম্পর্কে আবদ্ধ দুজন সাথী বিপরীত শিবিরে চলে যায়। বিশেষ সম্পর্ক  গুলি র মধ্যে ভাঙচুর  শুরু হয়। এই ধরনের একটি ঘটনাতে আমাদের একজনের মাকে জয়া হটাৎ গম্ভীর মুখে বলে ওঠে," মাসিমা দাদাভাই কে বলুন এখন বিশেষ কেউ মহাদেব করছে না , মহাদেব নিজেও আর মহাদেব করছে না। " সবাই হেসে ফেলে , পরিস্থিতি একদম পাল্টে যায়। 

জেলের খাবার খেয়ে সবাই অল্পবিস্তর পেটের সমস্যাতে ভুগত। জয়া অম্বল হলেই  একহাতে পেটে হাত বোলাত আর  অন্য হাতে পাখা দিয়ে পেটে হাওয়া করত। শেষে খুকু টেনে ধরে শুইয়ে তেলজল মিশিয়ে মালিশ করে দিত। জল খেতে চাওয়ায় আমি জল দেবার জন্য ওর হাতে একটা গ্লাস দিয়ে বাটি থেকে যেই জল ঢালতে যাই অমনি গ্লাস টা গোল করে ঘুরিয়ে চলে।  শেষে ধমক দিয়ে বলি ,"এমনি করলে তোকে জল  দেব কি করে। " 

কত ঘটনা যে মনে পড়ছে। হটাৎ জয়াকে হুগলী জেলে নিয়ে যাবে বলে নোটিশ এল।  আমরা মেয়াদী মাসিদের কাছ থেকে গুড়াকু এনে জয়াকে দাঁত মাঝ্তে বললাম। দাঁত মাজার ফলে জয়ার বুকের প্যালপিটিশন শুরু হল। তখন  ওকে শুইয়ে দিয়ে ওয়ার্ডার মাসিদের ডেকে দেখানো হল। আর রাজশ্রী তার প্রসিদ্ধ বাংলা ভাষায় বোলতে শুরু করল ," মাসি, দেখ জয়ার তো একেবারে এখন তখন অবস্থা। "একটা গুরুগম্ভীর পরিবেশ সৃষ্টি করতে গিয়ে আমরা বাকিরা তো বিষম খেয়ে অতি কষ্টে হাসি চাপি। রুগীর অবস্থা সত্যি করেই মহা বিপদজনক হয়ে ওঠে। এদিকে রাজশ্রী নির্বিকার ভাবে তার বক্তব্য বলেই চলেছে , সব ধাক্কা , চিমটি আর ইশারা ওর মাথার ওপর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। 

আমাদের সকলের মধ্যে এমন ঘনিষ্টতা ছিল যে আমরা প্রত্যেকে প্রত্যেকের জীবনের কথা, বাড়ীর কথা জানতাম। এই কারণেই জয়ার ছোট ভাই ভিয়েতের নামকরনের গল্প ও জানি। দ্রোণ ভিয়েতের নাম রাখে স্ফুলিঙ্গ, জয়া রাখে ভিয়েত। ছোট বেলায় ভিয়েত স্ফুলিঙ্গ উচ্চারণ করতে পারত না ,ইসফুলিঙ্গ বলত। এখন অবশ্য ও সবকটা নাম ই ব্যবহার করে।  

একটা সময়ে যখন পার্টির ব্যাপক ক্ষয় ক্ষতি হয়, সি পি আই এম এল পার্টি লিনপন্থী আর লিনবিরোধী দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায় ,তখন জয়া একটা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। একটা সময় যোগাযোগ রক্ষা করার কাজে যুক্ত থাকা  এবং দীর্ঘদিন পার্টি সংগঠনের কাজে যুক্ত থাকার ফলে ওঁর  পশ্চিমবাংলার বেশ কিছু এলাকার যোগাযোগ ছিল। জয়া মহাদেবকে সাথে নিয়ে সেই সব যোগাযোগ গুলি করিয়ে দেবার ফলে পার্টি পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে খুব সুবিধা হয়। 

মজার কথা হল মহাদেব যখন ধরা পড়ার পর চূড়ান্ত কাপুরুষের ভূমিকা নেয়, আমরা জয়াকে খুব খেপিয়ে ছিলাম এই বলে ,"তুই হলি যত নষ্টের গোড়া। তোকে কে মাথার দিব্যি দিয়েছিল মহাদেবকে সব যোগাযোগ করিয়ে দিতে। ও বেচারা র মত মুখ করে হাসতো। 

জয়া র সাথে আমার চুক্তি ছিল, প্রতিদিন সকালে আমি ওকে  ফোনে ফুল, পাতা যাই হোক কিছু পাঠাবো। আর ও আমাকে একটা কবিতা পাতাবে। এমন ই চলে আসছিল, একমাত্র অসুস্থতার সময় ছেদ পড়ত। এখন ওর সাথে সব আদান প্রদান বন্ধ। তবে ওর বোন উমা এখন সেই অভাব টা পূরণ করার চেষ্টা করে।

বন্দিমুক্তির পর আমরা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ি।  সবাই নিজ নিজ পরিস্থিতি ও চিন্তা ভাবনা অনুসারে কাজ কর্ম শুরু করে , সাথে নানা সামাজিক কাজ রাজনৈতিক কাজ করতে শুরু করে। পারস্পরিক দেখা সাক্ষাৎ না হলেও অন্তরের টান এত টুকু চিড় খায়নি। মাসিমা, মলয়া, বৌমা ,মীনাক্ষি আগেই চলে গেছে। এবার জয়াও আমাদের ছেড়ে চলে গেল। নিজের বয়সের ভারের সাথে সাথীদের সংখ্যা প্রায় শেষ হতে বসেছে বলেই এই বিচ্ছেদ টা কিছুতেই মানতে পারছিলাম না , পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম।  অনেক কষ্টে আজ ওকে মনে করে সামান্য কিছু লিখতে চেষ্টা করলাম।  

জয়ার কথায় এটাও বলা দরকার মনে হল। জয়া ছিল রত্নগর্ভা। ওর  ছেলে বাবুন আর ছেলের বউ শ্রীনু খুব আদর আর যত্ন দিয়ে জয়া কে অনেক কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে পার করে নিয়ে এসেছে, বাঁচিয়ে রেখেছিল ।


জয়া বার হবার পর থেকে বিভিন্ন গণসংগঠন আর গন  আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ও কোন  চাকরী করতে ইচ্ছুক ছিল না। কিছু খুচরো কাজ আর প্রুফ রিডিং এর কাজ ছাড়া নানা সামাজিক ও রাজনৈতিক কাজে যুক্ত থাকতে চেয়েছিল। হাজার শারীরিক অসুবিধা নিয়ে ও কোন সময়  কোন মিটিং বা কাজে গরহাজির হয়নি।  রাজনীতি ওঁর জীবনের একমাত্র কাজ হিসাবে ধরে নিয়ে ছিল। আর সেটাই ও করে গেল। আমদের জয়া / কৃষ্ণা বন্দ্যোপাধ্যায় রোদ্দুর হতে চেয়ে ছিল ।

^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^^






24 Feb 2025

আনিস তুমি কি জাত

আনিস তুমি কি জাত
*********************

আনিস তুমি কি জাত !
আনিস তুমি মানুষের জাত
তুমি প্রতিবাদীর জাত
তুমি মানবদরদীর জাত
উজ্জ্বল নক্ষত্রদের জাত। 
--
তুমি সহমর্মিতার প্রতীক
সমাজসংস্কারের নাম
আনিস আত্মত্যাগের প্রতীক
প্রতিরোধের আর এক নাম,
তুমি আন্দোলনের প্রতীক।
--
ঋজু তোমার মেরুদন্ড
মন ছিল সৎ, সরল, সতেজ, 
পথ  ছিল সোজা, সুকঠিন
আনিস মানুষের আশা, ভরসা, 
সমাজের প্রাণ ও পথের কান্ডারী
--
তুমি বরুনবিশ্বাসের বন্ধু,
তাপসী মালিকের ভাই
আনিস ভকত সিং এর উত্তরসূরী,
আজাদের জ্বালা আলোকবর্তিকা,
লালনের জাত, তিতুমীরনন্দন। 
---
আনিস ঊষর জমিনে মরুদ্যান,
পরিবেশের নির্মল বাতাস,
শাসক ও শোষকের বুকের ত্রাস
আনিস ভবিষ্যৎ শান্তির পারাবত,
উদীয়মান সূর্য্যের রক্তিম ঝলক। 
---------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

15 Aug 2024

একটি ছোট্ট মৌটুসীর খুন

একটি ছোট্ট মৌটুসীর খুন
*************************************

কাহিনী
+++++++
একটা ছোট্ট সাতরঙা মৌটুসী
ঝিলমিল করে ওড়ে আকাশে
খিলখিল হাসি ছড়িয়ে দেয় বাতাসে।

একটু বড় হলে মাকে বলে
সব পাখিদের সেবা করবে
সকলকে সে ভাল রাখতে চায়।

বেশ চলছিল উড়ে উড়ে 
সবার খোঁজ খবর রাখে
অসুখ হলে সেবা করে।

নিরলস খেটে সারিয়ে তোলে
সকলকেই, সকলেই ভালবাসে
সবাই মিলে মিশে বেশ দিন কাটে।

দূর থেকে শকুনদম্পতি দেখে 
হিংসায় জ্বলতে থাকে মৌটুসীর বাড়বাড়ন্তে
জব্দ করার ফন্দী আটে ।

যেদিন সারা আকাশ মেঘে কালো
হয়ে গেল, পথ হারাল ছোটসোনা
ঝাঁপিয়ে পড়ল শকুনদম্পতি তার চেলাচামুন্ডা সহ
যত হিংস্রতা ছিল তাদের নখে, ঠোঁটে
যত কালিমা ছিল মনে সব ঢেলে দিল
ক্ষতবিক্ষত মৌটুসী এলিয়ে পড়ল মাটিতে।

মা বাবা পাখী পাগলের মত খুঁজে বেড়ায়
অবশেষে মেঘে কেটে ফুটল আলো
সব পাখিরা নেমে এল মাটিতে আদরের মৌটুসীর কাছে, খবর পেয়ে উড়ে আসে বাবামা, ঠুকরে খাওয়া প্রানহীন সাতরঙা মৌটুসীর সব পালক ছড়িয়ে চারিপাশে, 
মাঝে খুন হয়ে যাওয়া তার ছোট্ট দেহটা।

কথা
+++++
হটাৎ আকাশ ছেয়ে গেল বিশাল পাখীর দলে
অতি ছোট্ট পাখী থেকে বিশাল বিশাল পাখি
খবর ছড়িয়ে পরার সাথে সাথে টুনটুনি, বাবুই, চড়াই, থেকে চিল, বাজ, ঈগল, ময়ূর, অস্ট্রিচ, পেঙ্গুইন। ঈগল সজোরে ঘোষণা করল, 'খাবার জন্য সকল কে শিকার করতে হয়, শুধু মাত্র ঈর্ষার থেকে এই হিংস্রতা মেনে নেওয়া, মহাপাপ। একে ক্ষমা করা যায় না।' কত শত পাখিরা সারা পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন প্রান্ত থেকে ।

ঘিরে ফেলল শকুনি দম্পতি আর  তাদের চেলাদের।প্রচন্ড ঘৃণা ও রাগে ঠুকরে ঠুকরে নিশ্চিহ্ন না করে কেউ থামল না। কঠিন শাস্তি দেখে সমঝে গেল সব হিংস্রতা, সব অন্ধকার।
অপূর্ব এক আলো নিয়ে ফিরে এল শান্তি, সুমধুর কণ্ঠে ডেকে উঠল দোয়েল, কোকিল, তোতা, স্কাইলারক।
***************************************************************************************************************************************************************************************************************************************************

15 Jul 2024

ছড়াক্কু

ছড়াক্কু  
----------
বৃষ্টি ভেজা দুপুরে 
জল ভাঙছে খুকুরে
মেঘ ডাকে গুরগুড়িয়ে 
খোকা হাঁটে তুরতুড়িয়ে।

বইছে বাতাস শনশনিয়ে
ছুটছে নদী খিলখিলিয়ে
নাচছে পাতা ঝিরঝিরিয়ে
ঝরছে জল টুপিটুপিয়ে।

ঘরের চালে ডাকছে ঘুঘু
ঝোপেঝাড়ে গাইছে কুহু 
গাঁয়ের বধূরা গাইছে টুসু 
গাঁয়ের মেয়েরা নাচছে বিহু।


-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
----------------------------------------------

রোজনামচা




রোজনামচা 
********************
প্রতিদিন ঘটে চলেছে কত ঘটনা। 
সকালের খবরের কাগজ আর টিভি তে 
প্রতিদিনের খবরে  মন খারাপ হয়ে যায়,
দুর্ঘটনা, খুন জখম মনের তারে ঘা দিয়ে যায়
সাধারণ মানুষের উপর নিত্য নতুন অত্যাচার,
বাজারের মূল্যবৃদ্ধি, মানুষের নাভিশ্বাস,  
ক্রম বদ্ধমান বেকারত্ব, আত্মহনন 
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা জগতে বেহাল অবস্থা, 
মেয়েদের ওপর দৈনন্দিন অত্যাচার 
সচেতন মানুষের মনে চাপ সৃষ্টি করে। 

22 Jun 2024

ব্যথা

ব্যথা
********

বুক চিন চিন যাপন, 
মরুভূমি বিবেক।
আবাল বৃদ্ধ বনিতা, 
জীবিত কিংবা মৃত, 
সুস্থ বা অসুস্থ সব 
এক দরে বিকোচ্ছে।
----
এ এক মর্মান্তিক, 
অমানবিক সময়।
দুঃস্বপ্নের কলের পুতুল 
উল্কাপাতে পোড়া মন  
স্থবির বনসাই জীবন।
আর কতকাল!
----
নারী তুই গর্ভে ধর আবার 
সূর্য সেন, ভগৎ সিং, কল্পনা,
প্রীতিলতা হাজার হাজার 
যাঁরা দেখাবে নতুন স্বপ্ন 
পথ দেখবে মাথা তুলে 
স্বাধীন ভাবে বাঁচার। 
+++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++==

বিন্দুতে দেখি সিন্ধু

বিন্দুতে দেখি সিন্ধু  
**********************
কেমন ছিল সে বিন্দু
কথা হতে এল !
সে বিন্দু ফেটে
সৃষ্ট এ বিশ্বব্রম্ভান্ড
এ মহাকাশ মহাশূন্য।
কোথা আদি কোথা অন্ত
সবই অজ্ঞাত এখন
মহাকালের লিখন।
 --
অযুত আলোকবর্তিকা
আবর্তিত বিশ্বচরাচরে
জ্বলে অনির্বান
কত সহস্র কটি নক্ষত্রপুঞ্জ
কেহ নাহি জানি
অদূরে দেখি যেন শুধু
অসংখ্য প্রদীপ আলোকশিখা  
নাম জানা অল্প কিছু গ্রহ তারা
চিনি শুধু এ পৃথিবীরে।
--
রূপে লক্ষ্মী
গুণে স্বরস্বতী
মোদের এ পৃথিবী
শ্যামল সবুজ বনানী
ফসলে উর্বরা ভূমি  
কত সহস্র নদী স্রোতস্বিনী
কত শত ঋজু পর্বতমালা  
শৃঙ্গে  বরফের মালা। 
--
কোমল বিচিত্র হরিণ শাবক
কেশর মন্ডিত সিংহ রাজকীয় 
চঞ্চল পাখীর মেলা কত তার রূপ
কত রঙ প্রজাপতি কি অপরূপ ,
কোকিলের কুহু তান
আর ভ্রমরের গুঞ্জন।
ময়ূর মেলেছে পেখম,
গরবিনী মরালী সাথে সন্তান সপ্তম।
--
কত সহস্র কুসুম কলি
ফুলে ফুলে মধু খায় অলি,
হাসে গোলাপ চামেলী
রজনীগন্ধা জুঁই শিউলী,
সুগন্ধে মাতোয়ারা ধরণী
জোৎস্নায়  মাতাল যামিনী,
সাগর তটে ঢেউ দুর্বার দুরন্ত
নতুন সূর্য্য লালে লাল পূর্ব দিগন্ত।
----
++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++


 

 

 

17 Oct 2016


কলংক
******
কোজাগরীর চাঁদ দেখতে গেলাম
চারিদিকের নিয়ন আলোর ঝলক,
বড়সড় চাঁদকে দেখতে পেলাম
নেই সেই আকাশ ভাসানো আলোক,
ঝিকিমিকি একঢাল তারাদের হারালাম
পৃথিবী যেন এক যান্ত্রিক জীবনের ফলক। 
 --
ধোঁয়াশায় মোড়া পূর্ণিমার আকাশ
অনুপস্থিত গ্রাম গঞ্জের খোলা মাঠে,  
গুমোট ক্যানভাসে লোভের বাতাস
প্রকৃতির স্নিগ্দ্ধতা মুছে বারুদ ফাটে,
কোজাগরীর চাঁদে বিদ্রুপের আভাস 
বিষন্নতা ছুঁয়ে গেছে গঙ্গার ঘাটে। 
--
পূর্ণিমার চাঁদ বলে এতদিন 
দেখেছ আমার কলংক যত
পৃথিবী ছিল ভাগ্যবতী বহুদিন 
মানুষ নাকি সবচেয়ে উন্নত 
তোমাদের লোভে কলংকিত পৃথিবীর আগামী দিন
সকল আশীর্বাদের মূল্যে প্রকৃতি আজ ক্ষত বিক্ষত।
___________________________________________________________________________________________






20 Jun 2024

আউল বাউল মনের কথা !

আউল বাউল মনের কথা !
**********************

চারি দিকে শুধু চাই চাই মন

দেহের প্রতিটি কোষজুড়ে খাই খাই, 

আটপৌরে মমিজীবন, 

খোঁপাভাঙ্গা চুলের বেমালমাল যাপন। 

নেশায় ডুবে থাকা ঘুণধরা মন,

লালসার উল্কাপাত পুড়ছে আমার শহর।

----

গ্রামগুলি পড়ে আছে 

নামগোত্র হীন জংলা জমির মত,

ঝড়ের ভ্রুকুটি, শব্দহীন চোখের জলে 

ডুবে যাচ্ছে আমার দেশ,

মেঘেদের হৃদয় মোচড়ানো কান্নায় 

ভাসে গাছেদের কুশপুত্তলিকা। 

----

 এক পাঁজর ভাঙা শূন্যতা আর

 নিঃসীম দ্বিপ্রহরের  একাকিত্ব,

সমস্ত পৃথিবীটাকে গিলে খাবার 

উদগ্র বাসনার অনুরণন  চারিধারে,

কুঁয়োর ব্যাঙের মত কালাতিপাত 

মহুলফুল, লাল পাহাড়ির দেশে 

আজ গ্রহণের কালো ছায়া।

----

ডানা ঝাপটানো ইচ্ছেরা কুন্দ আর

ফনী মনসার ঝাড়ে মাথা খুুঁড়ছে,

শাল পিয়ালের বনে লেগেছে আগুন 

গাছের বাকল, দীঘল চোখ মেলে তাকিয়ে, 

খসে পরা তারাদের মৌচাক মন 

শিউলিগন্ধ ভোরের আশায় জেগে।

----

শুরু হোক বোধন 

বেজে উঠুক ডাকাতিয়া বাঁশী,

আলুথালু ভাবনা,  ভুলভাল আবেগ

ছড়ানো ছিটানো ছন্নছাড়া মেঘরা,  

মায়াময় দ্বীপগুলিতে বারোমাসি স্বপ্ন 

সব মিলে এক বিদ্রোহী প্রতিচ্ছবি।

---

হৃদয়ে আলোঝরা রোদের ছোঁওয়া

ফুসফুস ভরে মহুল বাতাসের ঘ্রাণ, 

রাত্রির সাগরে ডুব দিয়ে উঠে 

চাঁদ ঝুলে থাকুক ছাদের কার্নিশে,

চলমান সময়ের নুপুর ঝংকার,

আঁচল ভরা গোধূলি আলোতে  

সেজে উঠুক পৃথিবী। 

-----

পাখীর পালকে লুকিয়ে থাকা 

স্বপ্নরা ডানা মেলুক,

আগামী দিন দেখুক 

রোদ গলানো সোনার ফসল, 

আবার জেগে উঠুক প্রবাল দ্বীপ,

অজন্তা-ইলরার মুঠো ভরা জ্যোৎস্না

 সিক্ত করুক মানুষের মন,

হরপ্পার আকাশে অগণিত গ্রহদের হাট বসুক। 

----

দিনবদলের দুরন্ত কোলাহল জেগে উঠুক 

বৃষ্টিভেজা স্বপ্নগুলি প্রজাপতির ডানায় ভেসে চলুক, 

গুড়ি মেরে ঢুকুক বেপরোয়া সূর্যের আলো  

মায়াবী  আলোআঁধারের মধ্য দিয়ে 

তির তির করে বয়ে চলে সময়,

ভোরের শিশিরসংপৃক্ত কবিতায় 

আছন্ন করুক মানবমন।

----

অন্তরে কত ইচ্ছা, সাদাকাল ছবির স্মৃতি, 

আজীবনের সাধগুলি মুক্ত বিহঙ্গের মত 

সাঁতার কাটতে চায় নীল আকাশে,

মনের গভীরে সুপ্তআখরগুলি 

বৈরাগী আলোয় চিত্রপটে ভেসে উঠুক 

এক ঘুমভাঙানী সাগর তটে, 

পানকৌড়ি দুপুরে রামধনু কলমে

লেখা হোক  বাউল জীবনকথা।

---- 

শিমুল পলাশের আদর মেখে উঠুক 

নতুন এক সূর্য্যমুখী ভোর,

এক আকাশ আদর মেখে 

রক্তিম শিশু সূর্যের  আলো 

ছড়িয়ে পড়ুক দিক থেকে দিগন্তরে ,

ধরণীর কোনে কোনে

রাঙিয়ে তুলুক মানুষের মনকে 

এক নতুন চেতনার রঙে। 

++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++


17 Jun 2024

যাপন

যাপন
**********

এক আকাশ স্বাধীনতা আর
ভূমিতে নিরাপত্তার আশ্রয় 
একটা মনকেমনের নদী  
কোথায় হারিয়ে গেছে!
--------
চাটুকারিতা, ভালবাসার আতিশয্য
পতনের পিচ্ছিল সোপান মাত্র। 
হাসি -আনন্দে- সুখ -শান্তির  
সূর্য ডোবে কান্নার সমুদ্রে।
-------
বিষে জর্জরিত মন
ছড়ায় বাতাবরণে বিষ,
নিঃশ্বাসে বিষ, চিন্তায় বিষ, 
বিষবৃক্ষ জীবন।
-----
বিবেক তুমি আজ কোথায়, 
তোমার অস্তিত্ব কি বিলীন হতে চলেছে।
অসহ্য এক স্থবিরতা, 
পাঁজর ভাঙা শূন্যতা 
দানা বেঁধেছে শরীর-মন জুড়ে 
-----
জীবনে ছিল এক মহাসাগর ভরা স্বপ্ন
এক আকাশ গোধূলি রঙা ইচ্ছে,
মহুলের গন্ধমাখা ঝোড়ো বাতাস
তরুণ দামাল বৃষ্টিঝরা উছ্বলতা ;
আজ শুধু একাকিত্বের হাহাকার।
-----

ছিল পাহাড়ের প্রমান প্রতিজ্ঞা
অরুন আলোর উদ্যম
জোৎস্না মেদুর ভালবাসা
মেঘআলোর জাফরীকাটা বাউলমন
যা ঝর্ণার কলতানে
সবুজ হাসি হাসতো।
-------
যতই কাঁটাতারে ঘের দাও
মানবতা কিন্তু সদাই মুক্ত।
যতই নিঃশ্চিদ্র পাহারা বসাও,
মানজাতির জন্মস্থান এই পৃথিবী।
জীবন যদিও পদ্মপাতায় জল,
মানবজন্ম কিন্তু চিরস্বাধীন।
------
পৃথিবীকে যাাঁরা দিতে চেয়েছিল
মহাকাশ জোড়া এক অনন্য রামধনু
যাঁরা সূর্য ধরতে চেয়েছিল
তাঁদের পথ তো আজও
আলোর দ্যুতি ছড়াচ্ছে। ।
++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++=




গনদেবী

গণদেবী , 
*************
হে মা দুর্গা, দুর্গতিনাশিনী 
অঙ্গে তোমার সোনার শাড়ী
নানা রত্নে খচিত মিনাকারী
সাথে কার্তিক, গণেশ, লক্ষী স্বরস্বতী,
মূল্যবান অলংকারে ভূষিতা
রাজকীয় মন্ডপে অধিষ্ঠিতা
সুচন্দন চর্চিতা, সুগন্ধি ফুলসাজে সজ্জিতা
কোটি কোটি অর্থে তুমি আজ আরাধিতা।
---
সহস্র কোটি জনগন 
নাকি তোমার সন্তান, 
কোথায় মা তাঁদের সহায়
জীবন বিভীষিকা ময়,
পরনে তাদের ছিন্ন বাস
প্রাত্যহিক উপবাস,
শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা
নেই কোন ভরসা।
---- 
তুলে নাও হাতিয়ার, জাগ গনদেবী
শ্রমিক রমণী তুলে নাও হাতুড়ি,
কৃষাণী ধর টাঙি, হে নারী আদিবাসী 
আনো বর্শা, বল্লম সকল মেহনতী নারী,
তোমরাই দূর্গা, তোমরা কালী
তোমরা চামুন্ডা, তোমরাই রনচন্ডী
তোমারা ধরিত্রী, তোমারই গনদেবী
নব জীবনদাত্রী, আলোর দিশারী।
---
চলমান স্রোত, তোমরা তো নদী
তোমরাই আশা, মন পরিযায়ী 
তোমরা স্বপন, আলোর দিশারী
জন্মভূমি, জন্মদাত্রী, বীর প্রসবিনী
গড়ে তোল এক নতুন পৃথিবী।

+++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++






24 May 2024

দাবানল

দাবানল 

*******

জঙ্গল পুড়ছ
পুড়ছে খেতখামার
কুঁড়েঘর পুড়ছে।

ভাঙছে পাহাড়
গ্রামগঞ্জ ভাঙছেউৎসাহ দেয় 
ভাঙছে ছাপোষা বাড়ী।

হারিয়ে গেছে পুরনো পাড়া
মূল্যবোধ হারিয়ে গেছে
হারিয়ে গেছে পাশের বাড়ী।
 
কাটছে গাছ
মানুষ কাটছে
কাটছে নদীর পাড়।

গড়ছে বহুতল
চোখ ধাঁধানো শপিংমল
গড়ছে আইটি সেক্টর।

লোপাট  মুদির দোকান
পাড়ার ডাক্তারখানা লোপাট
লোপাট দেশী ওষুধের দোকান।

বিক্রি হচ্ছে জুটমিল 
দেশের কারখানা বিক্রি
বিক্রি আছে মানুষের মগজ।

নিলামে উঠেছে ভালোবাসা
বিবেক নিলাম হচ্ছে
নিলামে উঠেছে মনুষত্ব।

জ্বলে ওঠ রে মানুষ জ্বলে ওঠ
প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ 
জ্বালুক প্রতিরোধের দাবানল।
*************************************************************************

19 Nov 2023

কান্ডারী, রাতের আকাশ

কান্ডারী
*******

মেঘ মেশানো ঝড়ো বাতাসে
ভেসে বেড়ায় চাঁদ ,
মৃত্তিকা হাতড়ে ফেরে
অন্ধকার রাত,
সমুদ্র উথাল পাথাল,
কান্ডারী সামাল সামাল । 


 -----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

রাতের আকাশ
**********

কৌতুকে চঞ্চল
ঝিকিমিকি তারার দল
চাঁদের গায়ে
মেঘের কাজল।
ঝলমলে রাত
উত্সবের নৈবেদ্য সাজায়। 
----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

25 Jul 2023

অপরাজিতা


অপরাজিতা
**************

বস্ত্রহীন দ্রৌপদী চলেছে মাথা উঁচু করে দৃপ্ত পদক্ষেপে,পাশে কৃষ্ণ নয়,
ঢালতরোয়াল হাতে রণসাজে সজ্জিতা নগ্ন  মনিপুরকন্যা চিত্রাঙ্গদা, 
আছে বল্লম হাতে উলুপী, কুঠার হাতে হিড়িম্বা, চক্র হাতে সুভদ্রা  
কুন্তী ছোট্ট কর্ণ কোলে, গান্ধারী খুলে ফেলেছে চোখের বাঁধন।  
কাঁটা জিভ হাতে খনা, পাশে যুদ্ধাস্ত্রে সজ্জিত রানী লক্ষ্মীবাঈ।  
--
সীতা, শকুন্তলা তাদের সব অপমানের জবাব দিতে প্রতিবাদে সামিল
বাদ যায়নি স্বামীর অভিশাপে শাপিত পাষাণী অহল্যাও ,  
 ইন্দ্রের কাঁচের স্বর্গ ভেঙে গুড়িয়ে বেরিয়ে এসেছে মেনকা,উর্বশী রম্ভা,  
নগরের নটি বাসবদত্তা, আম্রপালি, শ্যামা পায়ের শেকল কেটে মিছিলে উপস্থিত।
--
কন্যাকুমারী থেকে কাশ্মীরের বসনহীন, ধর্ষিতা আসিফারা  
কামদুনি থেকে, রাজস্থানের রূপ কানোয়ার উঠে দাঁড়িয়েছে 
জ্বলন্ত চিতা থেকে, তাদের প্রতি সমস্ত অন্যায়ের প্রতিকার দাবী করতে,
পার্কস্ট্রিটের সুজেট, চেন্নাই, মুম্বাই, দিল্লী থেকে নির্ভয়ারাও আজ অংশীদার। 

সর্বাগ্রে আছে টাঙ্গি হাতে সুমি মুর্মু, কাস্তে হাতে ফুলন মুর্মু, হাতুড়ি নিয়ে ঝানো মুর্মু,
আছে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের মত স্বাধীনতা সংগ্রামের শহীদেরাও, 
তরাইয়ের সপ্ত কন্যা, সহ অসংখ্য লড়াকু শহীদ মেয়েরা আছে সাথে,
গায়ের বস্ত্রহীনতা, বস্তাপঁচা কলঙ্কের ছাপ নিয়ে কোন মাথাব্যথা নেই. 
--
অত্যাচারী সামন্ততাত্রিক, সাম্রাজ্যবাদী শোষকদের
কোমর ভেঙে দিতে তারা উঠে দাঁড়িয়েছে।
ওরা একইসাথে আকাশের সমস্ত সূর্য, চাঁদ আর তারাদের মিলন ঘটাবে। 
ওরাই দূর্গা, ওরাই কালী, ওরাই অন্নপূর্ণা, ওরা অপরাজিতা। 
-------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

28 Feb 2022

জেনানা ফটকের ইতিবৃত্ত - পর্ব 2

জেনানা ফাটকের ইতিবৃত্ত  -  পর্ব ২ 
***********************
বোধহয় ভোরের দিকে চোখ লেগে এসেছিলো। হটাৎ বিকট এক বাজখাই গলায় চীৎকার," ফাইল, ফাইল।গুনতি, গুনতি।  ওঠ, ওঠ এই শালীরা।" তাকিয়ে দেখি মোঠা সোঠা লাঠি ধারী হেড জমাদারনি তার সাঙ্গপাঙ্গ,মানে  কিছু দালাল বন্দিনীদের সঙ্গে নিয়ে লক আপ খুলে ভেতরে ঢুকল। ঘরের বন্দিনীরা সবাই তাড়াহুড়া করে লাইন করে মাটিতে উবু হয়ে বসে গেল, নিভা আমার হাত ধরে টেনে একটা জাগায় বসে পড়ল। দালালরা কজন বন্দিনী আছে ,তাদের হিসাব নিল। নতুদের আলাদা করে নাম লিখে বলল," এই তোরা সকালের খাবার পাবিনা। ৯টার সময় কেস টেবিল হবে, তারপর দুপুর থেকে থেকে খাবার পাবি", বলে সদলবলে বেড়িয়ে গেল।
--
বন্দিনীরা প্রাতঃকর্ম সারা, স্নান করা আর খাবার জল ধরার জন্য হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দিল। কারণ দেরি হয়ে গেলে হয়ত সকালের খাবারটাই মিলবে না। নিভা তার খাবার নিয়ে এসে বলল," আমার থেকেই আজকে খা।" আমি অবাক হয়ে দেখলাম এক/ দেড় মুঠি ছোলা স্বেদ্ধ। ওতে নিভার ই পেঠ ভরবে না, আমি কি করে ভাগ বসাই। নির্বিকার চিত্তে নিভা বলল, "চিন্তা করিস না, তুই না নিলেও আমার পেটের এক কোনা ও ভরবে না। বলেছিনা এখানে পেটের আগুন কখন নেভেনা। জ্বলতে, জ্বলতে শেষে আর বোধ থাকে না।" জোর করে দেওয়া ছোলা মুখে তুলতে গিয়ে দেখি পোকা শুদ্ধ ছোলা। সেটা ফেলতে গেলে নিভা আমার হাত চেপে ধরল, "আরে করিস কি, পোকা ছোলা ফেলতে গেলে সব ফেলে দিতে হবে। চোখ বুঝে খেয়ে নে। দুদিনেই অভ্যেস হয়ে যাবে।"
--
খাওয়া শেষ না হতেই নিভা আমাকে হিড় হিড় করে টেনে নিয়ে চলল। "চল পাগল বাড়ীর দরজা খোলা, আমি ওখানে আগে থাকতাম। এইফাঁকে দেখেনে, হয়তো আর কোনোদিন দেখার সুযোগ পাবিনা।" জেলখানায় পাগলরা থাকে আগে জানা ছিল না। পরে শুনেছিলাম অনেকেই, বিশেষত যাদের আর্থিক সঙ্গতি নেই, তারা জেলখানায় মাথার গন্ডগোল হলে নিজেদের আত্মীয় স্বজন দের জেলে সেরে ওঠার জন্য দিয়ে যায়। যেমন নিভাকে দিয়ে গেছিল। তাছাড়া রাস্তা থেকেও পাগল দের ধরে এনে এখানে রাখা হয়। এরা সবাই নন ক্রিমিনাল লুনাটিক কেসে বন্দী।
 --
পাগল বাড়ী ঢুকে আমি পাথরের মত নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। গোটা তিনেক খাঁচার মত ঘর। সেখানে অনেক অনেক, একেবারে উলঙ্গ কঙ্কাল, মাথায় চুল জট পাকিয়ে গেছে। গা হাত পা নোংরায় কালো। এখানে সেখানে দগদগে ঘা।  অনেককেই হ্যান্ড কাফ দিয়ে, বা শেকল দিয়ে গরাদের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। যে যেখানে পেরেছে প্রকৃতির ডাকে কাজ সেরেছে। তারই পাশ থেকে খাবার খুঁটে খাচ্ছে। অনেকে আবার নিজেদের মধ্যে মারামারি, চুল টানাটানি, এমন কামড়া কামড়ি করে পরস্পরকে ক্ষত বিক্ষত করছে, রক্ত ঝরছে। কেউ গলা ফাটিয়ে কাঁদছে কেউ গালি গালাজ করছে।কাউকে মানুষ বলে চেনা যাচ্ছেনা। সাধারণ মানুষ ওখানে কদিন থাকলে পাগল হয়ে যাবে।
--
নিভা আমার হাত ধরে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে আসার পর সম্বিত ফিরে পেলাম। একটা জায়গায় আমাকে বসিয়ে জল খাওয়াল। একটু ধাতস্থ হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ওরা এ রকম কঙ্কালের মত কেন !" "কেন আবার ঠিক মত খাবার দেয় না। জানিস ডাক্তার বাবুরা ওদের জন্য কত বেশী বেশী ডায়েট লিখে দেয়, দুধ ,ফল বিস্কুট,পাউরুটি, মাছ সব। কিন্তু কিছুই ওরা পায় না। দালাল গুলি সব মারে। আমাদের সকলের খাবার থেকেও ওরা মারে। তাইতো এতো কম খাবার পাই আমরা।" "কিন্তু মেট্রন,ওয়ার্ডার রা কিছু বলে না !" "পাগল ওদের নির্দেশেই তো এসব চলে। ওরাই তো মোটা ভাগ পায়। দালাল রাও পেটমোটা হচ্ছে খেয়ে খেয়ে। আবার নিজেদের পছন্দের জিনিস আনাছে ওয়ার্ডারদের দিয়ে। সপ্তাহে একদিন মাছ আর একদিন মাংস দেবার দিন। সেদিন দেখবি মগ ডুবিয়ে মাংস খেয়ে ঢকঢক করে হজমের ওষুধ খাচ্ছে।"
--
ইতিমিধ্যে 'কেস টেবিল, কেস টেবিল' করে বিকট চিৎকার শোনা গেল। নিভা আমাকে নিয়ে গিয়ে কেস টেবিলের যাবার জন্য লাইনে দাঁড় করিয়ে দিল। আমাদের নতুন বন্দিনীদের দুইজন মেয়ে ওয়ার্ডডার আর একজন লাঠিধারী ছেলে ওয়ার্ডারের সাথে জেনানা ফাটক থেকে বেরিয়ে ছেলেদের ওয়ার্ডের মধ্যে একটা ফাঁকা জায়গায় দাঁড় করিয়ে দেওয়া হলো।সেখানে একটা টেবিলে একজন ডেপুটি জেলার, হেডজমাদার বসে একটা বিরাট জাবদা খাতায় নাম,ধাম ঠিকানা,  কেস ইত্যাদি লিখে নিচ্ছে। প্রায় ঘণ্টা দুয়েক পর ওয়ার্ডে ফিরলাম। আমাকে ডিভিশন ওয়ার্ডে রাখা হল। প্ররথমেই এই এই ওয়ার্ডডের  নামকরণের বিষয়ে একটা কথা পরিিিষ্কার করা দরকার। ইংরাজ রাজত্বে এখানে রাজবন্দিনীদের রাখা হত। তাঁরা ছিলেন মধ্য উচ্চবিত্ত পরিবারের মানুষ এবং বিশেষ সুযোগ সুবিধা প্রাপ্ত। কালক্রমে এখানে শুধু রাজনৈতিক বন্দিনীদের রাখা হত। আমাদের সময় শুধু নকশাল বন্দিনীদের রাখা হত, বিশেষ সুযোগসুবিধা বর্জন করলেও। প্রথম ছিল ক্লাস ডিভিশন , পরবর্তি কালে রাজনৈতিক মতাদর্শের ডিভিশন, যাতে আমজনতার মধ্যে সেই মতাদর্শ ছড়িয়ে না পরে।     
---
আমি  যেদিন ডিভিশন ওয়ার্ডে যাই তখন সেখানে  আর দোতলার সেলে শুধু নকশাল বন্দিনীদের আলাদা করে রাখা হয় যাতে তারা সাধারণ বন্দীনি দের সাথে মিশতে না পারে। শীলাদি ছাড়াও মুক্তি, বিজু আরও পাঁচজনের সাথে পরিচয় হল। ওপরে সেলে কল্পনা, ডালিয়া আর জয়া থাকতো। বিজু ছিল সবার ছোট, মুক্তি, ডালিয়া আমার সমবয়সী, কল্পনা আর জয়া (মিত্র) ছিল শীলাদির বয়সী। ১টা র সময় হেড ওয়ার্ডার তথা জমাদারনী এসে লক আপ করে দিল। 
--
ভাত খাবার পর বিজু পড়ল আমাকে নিয়ে। শুনলাম প্রতি সপ্তাহে এক মুটকি কেরোসিন তেলের গন্ধ ভরা মাথার তেল, এক মুটকি সরষের তেল আর একটুকরা কাপড় কাচার সাবান বন্দিনীদের প্রাপ্য। সেই কেরোসিন তেল ওরফে মাথার তেল বিজু আমার মাথায় জবজবে করে মাখিয়ে, কোষে বেঁধে বেশ কিছুক্ষণ ৱেখে দিল। তারপর একটা সরু চিরুনি দিয়ে জোরে জোরে আঁচড়াতে লাগলো। আর কেরোসিনের গন্ধে ঝরঝর করে উকুন পড়তে লাগল, মুক্তি সেগুলিকে মারতে থাকল। বিকালে ৪টের লকআপ খুললে বিজু কাপড় কাচার সাবান মাথায় গায়ে ঘষে স্নান করিয়ে দিল।প্রায় দিন ২/৩ দিন এই পর্ব চলল, পুলিশ থানার কম্বলে সঞ্চিত উকুন তাড়াবার জন্য। বিকাল ৫/৬ টার সময় আবার লক আপ হলে মুক্তি আর বিজু মিলে পুলিশ লক আপে মার খেয়ে আঘাতের জায়গায় সরষের তেল মালিশ করতে থাকে।যারাই নতুন আসে এইভাবে শুশ্রুষা করে সারিয়ে তোলাটা এখানকার রেওয়াজ। সাথীদের সাহচর্য্যে আর সেবায় শরীর মন দু ই শান্তি আর স্থিরতা লাভ করে। সন্ধ্যে বেলায় খাবার খেয়ে গল্প করা বা বই পড়া হত, প্রায়ই গানও  হত। মুক্তির গলায় অসাধারণ কাজ ছিল। বিজুর মিস্টি গলা ছিল। সবার শেষে  ইন্টারন্যাশনাল গাওয়া হত। এইভাবে শুরু হল আমার জেল জীবন।
**********************
(চলবে )



















  













23 Feb 2022

মিছিল

মিছিল 
************

মিছিল, মিছিল, মিছিল
মোমবাতি জ্বালিয়ে চলমান জনতা
পোষ্টার হাতে কিশোর, কিশোরী
স্লোগানে স্লোগানে দলবদ্ধ ছাত্রছাত্রী।
--
রাজপথ, জনপথ আজ আবার
মিছিলে মিছিলে ছয়লাপ,
এখনও প্রতিবাদ, প্রতিরোধে
মানুষ সামিল হতে জানে।
--
একদিন এই রকম কত 
অন্যায়, অবিচার বিরুদ্ধে 
কলরবের পুরোধা ছিলে তুমি, 
দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে গিয়েছিলে।
--
সে মিছিল একদিন গিয়েছিল
সেই আবীর রাঙা পলাশ গাছের
পাশ দিয়ে, যেখানে বসিয়েছিলে
স্কুলছুট বাচ্চাদের পাঠের আসর।
--
আর একটা মিছিল গিয়েছিল
সেই প্রাথমিক স্কুলের পাশ দিয়ে
যেখানে চলেছিল রক্তদান শিবির
রক্তের আকালে মানুষ ছিল অসহায়।
--
গ্রামের লোকেরা আজ দলবেঁধে চলেছে,
একদিন বন্যার প্রকোপে বিপর্যস্ত মানুষের
আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছ তোমরা সদলবলে
অন্নবস্ত্র তুলে দিয়েছো তাদের হাতে।
--
আজ সেই মানুষের ঢল নেমেছে 
প্রবল প্রতিবাদে তোমাকে হত্যার 
বিরুদ্ধে, ন্যায় বিচারের দাবীতে।
শাসকের সিংহাসন কাঁপছে 
জনতার মুষ্টিবদ্ধ হাতের উত্তলনে,
দলমত নির্বিচারে দৃপ্ত স্লোগানে।
------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

18 Sept 2021

মমতা

মমতা
****
সৃষ্টির আনন্দেই নবজন্ম
কাক দম্পতি তাই আস্তানা বেঁধেছে,
ডিম পাড়ার সময় আসন্ন
ঝাঁকড়া এক নিম গাছে।
--
কোকিল দম্পতির এক অবস্থা
তাদের পুরাতন সেই ছলাকলা,
তারা বাসা বাঁধতে পারেনা 
শুরু করে চিরাচরিত খেলা।
--
স্ত্রী কাক ডিম পাড়ে
পুরুষ কাকের সতর্ক প্রহরা,
পুরুষ কোকিলের কুহু তানে
চারিধার মাতোয়ারা।
--
ক্ষিপ্ত পুরুষ কাক পিছু নেয়
স্ত্রী কাক যায় খাবারের আশায়,
স্ত্রী কোকিল ডিম পেড়ে যায়
নির্জন কাকের বাসায়।
--
কাক দম্পতি আসে ফিরে
বাবা কাক দেখে খাবারের যোগাড়,
মা কাক তা দেয় ডিমে,
সাথে তীক্ষ্ন দৃষ্টি চারিধার।   
--
পল পল সময় যায়
ডিম ফোঁটে, ছানা হয় বার,
মা মুখে মুখে খাওয়ায়
বাপের আনা খাবার।
--
শেষে এক রাতে
শুরু হল প্রবল ঝড়, জল,
ছানা সহ বাসা গেল পড়ে
ভেঙে গাছের ডাল।
--
বাপে মায়ে মিলে
আগলায় ছানা,
প্রচন্ড ঝড় জলে
মেলে দিয়ে ডানা।
--
সুবাতাসে পাখীর কাকলি
ভোর এলো আলোর পাখায়,
ফেরে কাক দম্পতি,
নিয়ে ছানাদের নূতন বাসায়।
--
স্বস্নেহে তাকায় ছানাদের পানে
গেছে যেন অনেক খানি বেড়ে ,
ঠোঁট ঢোকায় ঠোঁটের মাঝখানে
মাত্র একটা দিনের ঝড়ে।
--
'আরে মোদের তো তিনটি,'
হটাত বাপ বলে ওঠে,
'আর বাকী কটি!
কোকিলের  ছানা বটে!
--
দেই ওদের ফেলে।'
'আরে ছিঃ! কর কি!'
স্বভয়ে মা বলে,
'আমরা যে পাখী।
--
শুনেছি সর্বোত্তম মনুষ্য কুল
ত্যাগে সদ্যজাত নির্দয়, নির্ভুল
মোরা তো নিছক পক্ষী কুল
কেমনে করি এ মহাভুল।'
-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------












































27 Jun 2021

দাপট

দাপট
****

একদিনের ঝড়ের দাপটে
রাধাচূড়ার নরম সোনালী
ফুলগুলি ঝরে গেছে।
বিদ্ধস্ত  বড় বড় গাছেরা
হাত পা ভেঙে পড়ে আছে।
তছনছ হয়েছে কত পর্ণ কুটীর।
প্রকৃতি চলেছে
প্রকৃতির নিয়মে ,
মানুষ বলি হচ্ছে ,
মানুষের নিয়মে।
-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

30 May 2020

অনামিকা

অনামিকা
*******
রোদের কনকচাঁপা আলোয়
কে তুমি শুয়ে আছ অনামিকা
নিস্তব্ধ, নিথর দেহবল্লরি,
চাদরে ডাকা নিঝুম, নিশ্চুপ।
---
ওঠ, চোখ মেলে চাও
দেখ তোমার বুকের মানিক
তোমাকে ডেকে চলেছে
অসহায় আকুল আধো বুলিতে।
---
ছোট্ট শরীরটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে
পড়ছে তোমার বুকের পরে
সাড়া না পেয়ে ক্ষুদে ক্ষুদে
হাতে টাানছে তোমার চাদর ।
---
ছোট ছোট পায়ে  চক্রাকারে
ঘুরছে তোমারই  চারিপাশে
ওর যে বড় খিদে পেয়েছে
তুমি ওর একমাত্র অবলম্বন।
---
বহুপথ বুঝি পার হয়ে এসেছ
পায়ে হেঁটে, দমবন্ধ বাাসে, ট্রেনে
তৃষ্ণার্ত, ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত, অবসন্ন দেহে
বুকের দুধ দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছ সন্তানকে
---
আজ তুমি  নিস্প্রান অনামিকা
ছোট্ট সোনামনিটার তো সেটা
জানা নেই, বোঝার কথাও  নয়
স্থবির চারিপাশ আজ শূন্য,খাঁ খাঁ।
---
নিশ্চল তুমি যে ভুঁয়ে পড়ে আছ
তার কান্না শিশু তো বোঝে না
বাতাসের হাহাকারও তার
অন্তরে জানান দেয় না।
---
কঠিন কঠোর সময়
বিবেহীন সমাজ শুস্ক 
চোখে শুধু  চেয়ে দেখে
দুহাত বাড়িয়ে কোলে টেনে
নেবার কেউ কোথাও নেই
নির্মম নির্দয় এক স্বার্থপর দিন।   
---
নিস্তব্দ্ধতার মাঝেও যে
শব্দ থাকে তাও এখন স্তব্ধ
ঘনঘোর অন্ধকারের মাঝে যে
আলো থাকে তা নিশ্ছিদ্র কালো
মানুষ আজ মুক, অন্ধ, বধির !
এ শিশুই হয়ে উঠুক আগামী দিনের যীশু।
--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------











17 May 2020

লংমার্চ

লং মার্চ
********

সৃষ্টিকর্তার রক্তে হোলি খেলা চলছে
যাঁরা সভ্যতার ইমারত গড়ে
সমাজ আর জীবনের স্তম্ভ যাঁরা,
প্রতিদিন দেশজুড়ে তাঁদের রক্তের আলপনায়
রাঙা হচ্ছে রাজপথ, মেঠোপথ, নদীপথ, রেলপথ।
----
বুভুক্ষু,তৃষ্ণার্ত অবসন্ন মুখগুলি
জীবন বাজি রেখে ফিরছে ঘরে
ঘুঘুডাকা গ্রামে, নিজহাাতে ছাওয়া কুটিরে,
আচমকা লকডাউনের জেরে 
এদেশ আজ লাশকাটা ঘর,
যাঁরা মানুুুষের বেঁচে থাকার শর্ত
তাঁরাই  আজ পাশার ঘুঁটি। 
----
ইতিহাস কিছুই ভোলে না,
আজকের অসহায় মুখগুলো
একদিন ইস্পাত কঠিন হবে
আজকের অপমান তাঁরা ফিরিয়ে দেবেই দেবে
হাতের সবল পেশীগুলি মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠবে
ঘুরে দাঁড়াবে, নতুন যাত্রা শুরু হবে
নতুন এক দিনের পথে।

---------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------














  

2 May 2020

প্রবাসী শ্রমিক - ২

প্রবাসী শ্রমিক - ২
****************
  
জয়িতা আর শিখা শিয়ালদহের মোড়ে দেখা করে হ্যারিসন রোড ধরে চলতে শুরু করল, ৭১সালের এক দুপুরে। কথা বলতে বলতে বেশ কিছুটা হাঁটার পর রাস্তায় একটা বেশ সাজান গোছান মিষ্টি / সিঙাড়া / কচুরীর  দোকানে ঢুকল।ভেতর দিকে বসে কিছু খাবার জন্যে সেই ফাঁকে কাগজপত্র আদানপ্রদান আর  কথাবার্তা বলে নেবে বলে। দুটো করে কচুরী/ডাল আর চায়ের অর্ডার দিল।
---
যিনি খাবার দিয়ে গেলেন তিনি ওদের টেবিলের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ছিলেন দেখে ওরা তাঁর সাথে কথা বলতে শুরু করল, কি নাম, দেশ কোথায়, বাড়ীতে কে কে আছে, গ্রামে জমিজমা আছে কিনা, ডিউটি আওয়ার্স কতক্ষন, ক্যাজুয়াল না রেগুলার স্টাফ, কতদিনে বাড়ি যান, মজুরী কত ইত্যাদি। নাম তাঁর গণেশ, চব্বিশ পরগণার মানুষ। কথা হচ্ছিল গণেশদার কাজের ফাঁকে ফাঁকে, অন্যান্য টেবিলে খাবার দেবার সাথে সাথে। আরও বেশীক্ষন বসার জন্য আবার দুটো করে কচুরী, আর চা নিল ওরা। ক্রমে ক্রমে রাজনৈতিক কথাবার্তা বলতে শুরু করে দিল। ভর দুপুর, দোকানে বেশী খরিদ্দার ছিল না। তাছাড়া ওই দোকানে অল্প বয়সী ছেলে মেয়েদের ভীড় বেশী,তারা বসতো অনেকক্ষণ, তাই ওরাও সেদিন প্রায় তিন ঘন্টা কথা বলল। গণেশদার ডিউটি শেষ হতে, ওরাও উঠে পড়ল। আবার দেখা হবে বলে চলে এল।
---
দুদিন বাদে আবার ওরা প্রায় একই সময়ে দোকানটায় গেল গণেশদার সাথে কথা বলার জন্য। সেদিন নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে কিছু বই আর পার্টির কাগজপত্র দিয়ে এল। ঘন্টা তিনেক আগের দিনের মত কথাও  বলতে থাকলো। সেদিন একটা নতুন ঘটনা ঘটল। চারটে করে দুজনে কচুরী খেয়ে দাম দিতে যাওয়ার সময় গণেশ দা মালিককে দুটো করে কচুরীর দাম বললো। এভাবে আরও দুদিন যাবার পর ঠিক হল জয়িতা এখনকার যোগাযোগ রাখবে, দরকার হলে শিখা সাহায্য করবে।
---
মাস দুয়েক যাবার পর গাণেশ দার মাধ্যমে মানিক দা, নির্মল দা, বনমালী, অজিত এই রকম ৫/৬জনের সাথে আলাপ হয়ে গেল। গনেশ দা তাঁদের মধ্যে রীতিমত রাজনৈতিক প্রচার চালিয়ে ৫/৬ জনের একটা ইউনিট তৈরী করে ফেললেন। নিয়মিত দেখা সাক্ষাতের ব্যবস্থা হল। আস্তে আস্তে দোকানের মধ্যে আলোচনার সময় কমিয়ে বাইরে এক এক দিন একজন বা দুজনের সাথে দেখা করে কথা বার্ত্তা হতে লাগল, লোকাল মাস্তান,পুলিশের খোচরদের দৃষ্টি এড়ানোর জন্য। রাতে দোকানের মালিক চলে গেলে একজন ছেলে কমরেডের সেল্টার নেবার ব্যবস্থা হল। ওখানকার শ্রমিকদের মাধ্যমে চব্বিশ পরগনা, মেদিনীপুর, হাওড়া তিনটি জেলায় গ্রামে কমরেডদের যাবার রাস্তা তৈরী হল। তাঁরা হপ্তা শেষ হলে হপ্তার টাকা নিয়ে যখন বাড়ী যেতেন তাঁদের সাথে ছেলেরা চলে যেত, এবং তাঁদের মাধ্যমে গ্রামগুলিতে পার্টি ইউনিট গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালাত।
---
শহরের দোকানের  যোগাযোগ টা মূলতঃ জয়িতা রাখত। গণেশদাদের কথা মত সে সকাল আটটা নাগাদ দোকান খোলার সময় যেত, কারণ তখন মালিক অনুপস্থিত থাকত। তাছাড়া পাড়ার মাস্তান বা খোচরদের আনাগোনা  প্রায় থাকতো না।  রীতিমত ভরপেট কচুরী, নানা মিষ্টি দিয়ে তাঁরা শুধু সকালের কেন প্রায় দুপুরের খাবার খাইয়ে দিতেন, কোন বারণ শুনতেন না। শুধু দুটো কচুরী আর এক কাপ চায়ের দাম দিয়ে চলে আসতে হত। শহরের শ্রমিক অঞ্চলে তাঁরা মাঝে মধ্যে ৫/৬ জনের সাথে বসার ব্যবস্থা করতেন। বছর দুয়েকের মধ্যে একই সাথে ওখানকার শ্রমিকরা গ্রাম আর শহরে পার্টির কাজ চালাতে শুরু করেছিলেন। তাঁরা বেশীর ভাগ ই ছিলেন প্রবাসী  শ্রমিক বসত ভিটে ছাড়া কিছুই প্রায় ছিল না, পেটের তাদিদে গ্রাম থেকে শহরে এসেছিলেন কাজের সন্ধানে। সর্বহারা শ্রেণী শেকল ভাঙার লড়াইয়ে এভাবেই ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে।
------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------













,