24 Feb 2020

শিখা

শিখা
******
প্রদীপের আলোর মত অমলিন জীবন ছিল তোমার। এমন সহজ, সরল, সহৃদয় মন এখন দুর্লভ। এত বড় হৃদয় ছিল তোমার যে কত জনকে প্রয়োজনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছ। এমন কি স্বামী পুত্রের অজান্তে তাঁদেরই একান্ত আপনজনদের নিজের অতি কষ্টে জমান অর্থ দিয়ে সাহায্য করতে। সারা জীবন নিঃশব্দে শারীরিক আর মানসিক যন্ত্রনার ভার বহন করে গিয়েছ কি করে? অথচ কি ভীষন কোমল আর নরম স্বভাবের মানুষ ছিলে তুমি।
---
আর তোমার এই গুণগুলি আমাকে তোমার প্রতি আকর্ষণ করেছিল, এক নিঃস্বার্থ বন্ধুত্বের বাঁধনে আমাদের দুজনকে বেঁধেছিল।স্কুল, কলেজের বন্ধুত্বের চাইতে অনেক দৃঢ় ছিল আমাদের বন্ধুত্ব।
বাচ্চাদের নিয়ে বইমেলায় বা সুভাষমেলায় যাওয়া। দুজনে একসাথে বেড়াতে যাওয়া, বাজার ঘাটে যাওয়া, সব ছবির মত চোখের সামনে ভাসছে।তুমি নেই এ কথাটা এখনো বিশ্বাস করতে পারছিনা।
---
কেউ অন্যায় ব্যবহার করলে কোন প্রতিবাদ করতে পড়তে না, নীরবে চোখের জল ফেলতে। তারজন্য কত বকেছি তোমায়, ভাবতে আজ বুকটা ফেটে যাচ্ছে। আমাদের দুজনের কষ্টের মলম ছিল দুজনের সাহচর্য। আবার হাসি, আনন্দের সাথীও ছিলাম দুজনে দুজনের। তুমি ছিলে আমার জীবনে এক দুর্লভ প্রাপ্তি। একথা আমি কিছুতেই ভুলতে পারিনা,  আমার প্রতি তোমার নিঃশর্ত বিশ্বাস, ভালবাসা আর নির্ভরতা। এটা তোমার একান্তই নিজস্ব গুন যা আমাকে অবাক করে দিত। নিজের কাছে নিজেই কুন্ঠিত থাকতাম।
---
একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষাদিবস। এই পুণ্যদিনে অসীম অনন্তের পানে তুমি পা বাড়ালে আমাকে একলা করে দিয়ে। কিন্তু তোমার এই চলে যাওয়াকে আমি এখনও কিছুতেই মেনে নিতে পারছিনা, সত্যি কথা বলতে, তোমাকে আগের মত খুব বকতে ইচ্ছে করছে। আমার মনে তুমি চিরকাল বেঁচে থাকবে শিখা। তোমার আলোয় আমাকে পথ দেখিও বন্ধু আমার।
---------------

11 Feb 2020

সন্তরণ

সন্তরণ
********
অথৈ জলরাশি ফুঁসে ফুঁসে উঠেছে
সুবিশাল ঢেউ, ঢেউ এর পর ঢেউ
প্রবল কলোরোলে আছড়ে পড়ছে তটভূমে 
সব কিছুকে আকর্ষন করে ফিরে চলে অনন্তের পানে। 
জোয়ার ভাটা, আকর্ষণ বিকর্ষণ, কূলে অকূলে
নিরন্তর খেলা আর খেলা, ভাঙা আর গড়া। 
--
থৈ থৈ জল, মানুষ  হাতপা ছুঁড়ে চলেছে 
উদয়ের পথে এগিয়ে যাবার বাসনায়
কখনো জোয়ারের বিপুল টানে ভেসে যাওয়া অনেক দূর
পর মুহূর্তে ভাটার টানে তার চেয়েও বেশী পিছিয়ে আসা 
তবু দুরন্ত প্রচেষ্টা দিগন্তের নীলে সাঁতার কাটার 
কত যে সাধ নীল আকাশে মুক্ত বিহঙ্গের মত পাখা মেলা।
--
অন্তরের গোলাপী ইচ্ছেরা সবুজ প্রজাপতির মত পাখনা মেলে 
আজীবনের গোপন স্বপ্নগুলি বরফসাদা খরগোশের মত চকিতে সামনে এসে দাঁড়ায়,
মৌচাক মনে সুপ্ত পুরাতন আখরগুলি বৈরাগী আলোর চিত্রপটে ভেসে ওঠে
ঘুম ভাঙানি বেলাভূমির আকুল করা আহবান গানের মত মর্মে প্রবেশ করে
মায়াময় প্রবাল দ্বীপ, রাতের সাগরে ডুব দিয়ে ওঠে মুঠো ভরা জোৎস্না 
ঝড়ের ভ্রূকুটি কে উপেক্ষা করে শুধু এগিয়ে চলা খসে পড়া তারাদের ধরতে। 
-------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------







12 Jan 2020

সময় - 3

সময় - 3
*************

সময় ছুটে চলেছে নিক্তির ওজনে
দাঁড়িপাল্লার মত দোদুল্যমান জীবনপ্রবাহ ;
---
একদিকে সর্বগ্রাসী ক্ষুধা, সারা পৃথিবীটাকে গিলে খাবার চেষ্টা
হৃদয় মোচড়ানো উন্মত্ত ঢেউয়ের ঘূর্ণাবর্ত,
মেঘেদের নিঃশব্দ হাহাকার আর দ্বিপ্রহরে মলিন আলোর একাকিত্ব,
বিধ্বংসী উল্কাপাতে পুড়ে যায় নোঙ্গর ফেলা জীবনযাত্রা।
---
অন্যদিকে পাখির পালকে লুকিয়ে থাকা কত সোনালি স্বপ্ন, 
বিশাল জঙ্গল ঘেরা পাহাড়ের পায়ের কাছে এলিয়ে থাকা আদিবাসী গ্রাম,
শাল পিয়ালের বনে দ্রিমিদ্রিমি মাদলে ডানা ঝাপটানো ইচ্ছেরা
আর বুকভরা মহুলফুলের মাতাল করা ঘ্রাান মেশাা নিঃশ্বাস। 
---
মহাশূন্যে ফুটে আছে অজন্তার, ইলোরার চাঁদ, তারারা
গুঁড়ি মেরে ঢোকা শিউলিগন্ধ ভোরে মায়াময় আবেশ,
গোধূলীর আলোমাখা আঁচল আর সাদাকালো মেঘের জাফরী
হরিণের চকিত অধরা চাউনি আর মুঠোভরা জোৎস্নার স্বপ্নিল আশা।
---
চতুর্দিকে শুধু মন আর দেহের প্রতিটি কোষের আগ্রাসী লালসার
পরিবর্তে, তির তির করে বয়ে চলা সময়ের নূপুর ঝংকারের সাথে
দমরু হাতে জনতা নটরাজের প্রলয়ংকরী তান্ডব নৃত্যে,
অগ্নিশুদ্ধ রক্তিম শিশুসূর্যের যেন নতুন এক ভোরের আহবান।
/-------------------------------------------------------------------------/------------------------------------------------------------------------------------/

1 Jan 2020

আরও একটা বছর

পৃথিবীর আরও একটা বছর বয়েস বাড়ল,
প্রকৃতির আরও একটা বছর বয়স বাড়ল,
আর বয়স বাড়ল বিশ্বব্রম্ভান্ডের ,
তোমার, আমার সকলর ই আরও একটা করে বয়েস বাড়ল,
কিন্তু মানুষের কি বয়স বাড়ল!
আশা করতে দোষ কোথায় একদিন মানুষের বয়েস ঠিক বাড়বে।
আর কোন কাশ্মীর, বা আসাম ঘটবে না,
কোন শিক্ষাঙ্গন রণাঙ্গনে পরিণত হবেনা,
আর কোন শিশু আর নারী ধর্ষিতা হর্বেনা।
মানুষের রক্তে কলুষিত হবে না মানুষের হাত,
পৃথিবীর বুকে আর কখন সাম্রাজ্যবাদী আর সন্ত্রাসবাদীদের কালহাত  
আর কোন সিরিয়া বা ইরান,
আফগানিস্তান বা প্যালেস্টাইন ঘটাতে পারবেনা।
মহাকালের রথচক্রের সাথে তাল মিলিয়ে পরিণত হবে তাদের বিবেক, বুদ্ধি, বিচার ক্ষমতা,
বাড়বে সহনশীলতা, প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠবে।
জন্মসূত্রেই সে যে বিশ্বনাগরিক, সে সত্য কে হৃদয়ে উপলব্ধি করবে,
দুহাজার কুড়ি যেন এই শপথে নিজেকে রাঙিয়ে তুলতে পারে

9 Dec 2019

দুই সখীর গল্প

ভূমিকা
*******
 কালীঘাটে যে ভিখারিনী শিশুদুটি ধর্ষিতা হয়েছে, আর প্রতিদিন সমাজের প্রান্তিকশ্রেণীর যে সব শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধারা সকলের চোখের আড়ালে ধর্ষিতা হয়ে চলেছেন,  বিচারের নামে যে প্রহসন সহ্য করেন, তাঁদের সকলের স্মরণে আমার আজকের লেখা।
-------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

দুই সখীর গল্প
**********
মিতা আর শোভা দুই বান্ধবীকে জেলে সব সময় একসাথে সকলে দেখতে অভ্যস্থ ছিল। দুইজনেই রেপ কেসের ভিক্টিম হিসাবে জেল কাস্টডিতে ছিল। মিতার সাধারণ ঘরোয়া চেহারার মধ্যে দুটি উজ্জ্বল, বুদ্ধিদীপ্ত, চোখ আর শান্ত কিন্তু দৃঢ়চেতা মুখের ভাব ওকে অসাধারণ করে তুলেছিল। স্বল্পবাক ও কিন্তু মিশুকে সহজে সবার আপন হয়ে উঠত। অন্যদিকে শোভা ছিল রীতিমত সুন্দরী, উচ্ছল স্বভাবের মেয়ে। বিপরীত স্বভাব হলেও  দুজনে ছিল হরিহর আত্মা।   
---
মিতারা ছিল পূর্ব বাংলার লোক। জমিজমা কিছু ছিল না, বাবা ছিলেন স্থানীয় প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক। এক ছেলে তিন মেয়ে নিয়ে মোটামুটি চলে যেত। সব ছেলেমেয়েই স্কুলে যেত। মিতা ছিল মেজ এবং ভাইবোনদের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী, বাবা আর বড় বোনের মিতাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ও গর্ব। দিদি যখন সবে স্কুলের গণ্ডি পার হয়, তখন বাংলাদেশ যুদ্ধ চলছিল। ইয়াহিয়া খানের সৈন্যদের ভয়ে মিতারা ভারতে চলে আসে। কিন্তু বাবা দেশ ছেড়ে আসার দুঃখ সহ্য করতে পারেননি। এদেশে কাজকর্মের বিশেষ সুবিধা করতে পারেননি। বড় মেয়ে পড়াশুনা ছেড়ে দুইবেলা বস্তিতে বস্তিতে বাচ্চাদের পড়ানোর কাজ শুরু করে, বাবাও প্রথমে তাই করতেন। তাঁদের দুজনের প্রবল ইচ্ছা মিতার পড়াশুনা যাতে বন্ধ না হয়, যদিও মিতার মা এ ব্যাপারে ঘোরতর বিরোধী ছিলেন। মিতা ঘরের কাজকর্ম, ছোট ভাইবোন দুটিকে দেখাশুনার সাথে তার পড়াশুনা বাবা ও দিদির সাহায্যে চালিয়ে যেতে থাকে। ইচ্ছে প্রাইভেটে বোর্ডের পরীক্ষা দেবে। 
--
কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই বাবার মৃত্যু সব স্বপ্নকে চুরমার করে দিয়ে যায়। দিদির একার পক্ষে পুরো সংসারের দায়িত্ব নেওয়া অসম্ভব হওয়াতে মিতা দিদির অমতেই একটা কারখানায় কাজ যোগাড় করে নিতে বাধ্য হয়। তবে বাড়ীতে মায়ের তীব্র বিরোধীতা সত্ত্বেও সব কাজের মধ্যেও রাত জেগে পড়াশুনা চালিয়ে যেতে থাকে। দিদি অবশ্য সবসময় তাকে উৎসাহ দিয়ে যায়। কিন্তু এই টুকু সুযোগ ও তার জীবন থেকে হারিয়ে গেল। 
---
সংসারের অভাব মেটাতে মিতা দিদির ঘোরতর অনিচ্ছা সত্ত্বেও প্রায়ই ওভারটাইম করত। ফিরতে রাত হয়ে যেত, তার বিপদের আশংকায় দিদি অস্থির হয়ে পড়ত। বড় রাস্তা থেকে একটা কালভার্ট পেরিয়ে তাদের বস্তির পথ। সেখানে শাসক দলের কিছু বাজে ছেলে মদ খেয়ে মাতলামি করত, মেয়েদের পিছনে লাগত। দিদির ভয় কে সত্যি করে একদিন মিতার ফিরতে একটু বেশী রাত হয়ে যায়, সারা রাস্তা নির্জন, তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে আসার পথে মিতা তাদের খপ্পরে পড়ে।  অনেক অনুনয়, চেঁচামিচি, ধস্তাধস্তি করেও তাদের হাত থেকে মুক্তি পায়না। জনা ৫/৬ জন তাকে একটা নির্জন জায়গায় টেনে নিয়ে গিয়ে গণধর্ষণ করে, রক্তার্ত আর মুর্ছিত অবস্থায় ফেলে পালিয়ে যায়। 
---
সারা রাত উৎকণ্ঠায় থেকে কাক ভোরে দিদি দুই একজন বস্তিবাসীকে নিয়ে মিতাকে খুঁজে বার করে এবং থানায় খবর দেয়। পুলিশ মিতাকে ভিক্টিম হিসাবে তাদের সেফ কাস্টডিতে নেয়। এরপর সেই একই বস্তাপঁচা ইতিহাস। মিতা ঘটনার যথা সম্ভব বর্ণনা দেয়। বস্তিবাসী রা কালভার্টের ওপর সন্ধ্যারাতের বখাটে ছেলেদের মাতলামি, মেয়েদের পিছনে লাগা এবং অসভ্যতার কথা বিবৃত করে। মিতাকে পুলিশ কাস্টডি থেকে জেল কাস্টডিতে চালান করা হয়। কেস ফাইল হলেও কোন লাভ হয় না। টি আই প্যারেডে মিতা ঠিক মত কাউকে চিনতে পারেনি ,"একে অন্ধকার রাত, চেহারা গুলি ভাল করে বোঝা যায় না। ভুল করে যদি নির্দোষ কোন লোককে সনাক্ত করে ফেলি, মনের মধ্যে সেই ভয়রে দিদি,তাইতো সব গুলিয়ে গেল।"  মিতার দিদি মোটামুটি বোনের জন্য যথাসাধ্য করার চেষ্টা করলেও, মায়ের ঘোরতর আপত্তি এবং বখাটে গুন্ডাদের ভয়ে  মিতাকে ছাড়িয়ে বাড়ীতে নিয়ে যেতে পারেনা। আলিপুর প্রেসিডেন্সী জেল তার ঘরবাড়ী হয়ে দাঁড়ায়। 
---
শোভার ক্ষেত্রে ঘটনাটা ছিল অন্যরকম। শোভা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে, স্কুলে পড়ত। তাদের পাড়ায় একটি বড়লোক বাড়ীর ছেলে শোভার রূপে আকৃষ্ট হয়ে প্রেম নিবেদন করে। কিশোরী শোভাও তার প্রেমে পড়ে। সে প্রেমে কোন খাদ ছিল না, মনপ্রাণ দিয়ে ছেলেটিকে ভালবাসে, বিশ্বাস করে। তাই ছেলেটি বিয়ের প্রস্তাব দিলে নিজের বাবামা এর অমতে শোভা সাড়া দেয়। দুজনে পালিয়ে গিয়ে কালীঘাটে বিয়ে করে এবং ঘর ভাড়া করে থাকতে শুরু করে। মাস ২/৩ বাদে ছেলেটির হাতের পয়সা যথারীতি ফুরিয়ে যায়, ফলে বাধ্য হয় বাড়ী যায় টাকা যোগাড় করতে। ছেলেটির পরিবার সেই সুযোগে দুজকেই যার যার বাড়ী ফিরতে পরার্মশ দেয়, সামাজিক ভাবে তাদের বিয়ে দেবার প্রস্তাবে। দুজনে মহানন্দে বাড়ী ফেরে। 
---
কিন্তু ছেলেটা বাবামায়ের কথায় আত্মসমর্পণ করে, সম্ভবত শোভাকে যথেচ্ছ ভোগ করে তার নেশা কেটে যায়। এদিকে শোভা তখন সন্তানসম্ভবা। ছেলের বাড়ী থেকে তাঁদের এড়িয়ে চললেও, শোভা বিশ্বাস হারায় না। কিন্তু তার বাবামা ছেলের বাড়ীর মতলব বুঝে থানায় নালিশ করে। পুলিশ দুজন কে ধরে নিয়ে যায়, ছেলেটির বাবার প্রভাবে দুজনের জবানবন্দী আলাদা করে নেয়। কোর্টে কেসের শুনানির সময় শোভা সরল বিশ্বাসে সব কথা বলে এবং স্বীকার করে দুজনের স্বেচ্ছায় শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে। ছেলেটি সব অস্বীকার করে। ফলে পয়সার জোরে ছেলেটি জামিনে ছাড়া পেয়ে যায়। আর শোভা ভিক্টিম হিসাবে যথারীতি জেলকাস্টডি পায় এবং প্রেসিডেন্সী জেল তার আশ্রয় হয়।
---
শোভার মনের বিশ্বাস তাতেও ভাঙেনা। তার ধারণা হয় সন্তানের জন্ম হলে  তার স্বামী আর শ্বশুরবাড়ীর লোক সব ভুলে তাকে ঘরে নিয়ে তুলবে। এই স্বপ্ন বুকে নিয়ে তার দিন কাটে জেল হাসপাতালের তোষোকচাদর শূন্য খালি মরচে ধরা লোহার খাটে। যেদিন শোভা সন্তান প্রসব করল, তার আগের দিন তার স্বামী এক বড়লোকের একমাত্র মেয়েকে বিয়ে করে ঘরে তুলল। হাসপাতালে বাবামা এর মুখে এই খবর পেয়ে জীবনের প্রতি সমস্ত বিশ্বাস ভেঙে খান খান হয়ে গেল। গভীর রাতে বাচ্চাটা মরচে ধরা খাটে টিটেনাসে মারা গেল। কদিন পরে নির্বাক, হতবাক শোভা হাজতি নম্বরে বদলি হল। এই দুর্দিনে মিতা প্রথম শোভাকে কাছে টেনে নিল। সেই শুরু তাদের বন্ধুত্বের।
--
ধীরে ধীরে শান্তি মাসি, হাসিনা, হাওয়া বিবি, শ্যামলী ইত্যাদি সকলে মিলে পরম যত্নে তাকে ঘিরে ধরল, আর বাস্তব জগতে ফিরিয়ে আনল। কিন্তু বাবামা অনেক করে বাড়ীতে ফিরিয়ে নিতে চাইলেও শোভা ফিরতে চাইল না, "প্রতিদিন আমার চোখের সামনে নতুন বৌ নিয়ে সে ঘুরে বেড়াবে, আমাকে দেখিয়ে আনন্দ করবে, আমাকে বিদ্রূপ করবে, সে আমার আত্মায় সহ্য হবে না, সম্মানে লাগবে। আমার মত বোকার পক্ষে এই জেল ই ভাল। " কিন্তু জেল যে কেমন নরক, পদে পদে মৃত্যু  এখানে ফাঁদ পেতে বসে, ধীরে ধীরে শোভা সেটা বুঝেছিল।              
---
মিতা হাসিনাদের মত আমাদের সাথে মেয়াদী নম্বর দিয়ে কথা বলত, আমাদের রাজনীতির কথা শুনত। আমাদের সঙ্গে, বিশেষ করে মীনাক্ষীর সাথে খুব বন্ধুত্ব হয়। শোভা কিন্তু আমাদের একটু এড়িয়েই চলত,কল্পনার সাথে একটু সহজ ছিল। প্রতিবাদ দেখলে সরে যেত। অবশেষে এল সেই দিন যেদিন হাসিনা, মিতা, হাওয়াবিবি, মদিনা, শান্তিমাসি, শ্যামলী ইত্যাদি প্রায় জনা ২০/২৫ মেয়ে কম খাবার দেওয়া,  হয় কথায় নয় কথায় মারধর করা ইত্যাদির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল, লক আপ হল না।  আমরা ওদের সমর্থনে লক আপ হলাম না। মিতা সহ সব বান্ধবী প্রতিবাদে নেমেছে সেখানে শোভা দূরে সরে থাকে কি করে, সে ও যোগ দিল। সেদিন ওই লড়াইয়ের মুখে কতৃপক্ষ নত হয়, দালালরা ক্ষমা চায়, মেট্রন ঠিক মত খাবার দেবার আশ্বাস দেয়। অবশ্য সাধারণ বন্দিনীদের মধ্যে প্রতিবাদী মুখগুলি কে চিনে রেখে দিল।
---
জেলে অনেক অসৎ কর্মচারী ও ওয়ার্ডার রা বাইরে রেড লাইট এরিয়ার মাসি ও দালালদের সাথে যোগাযোগ রাখত। সুযোগ বুঝে অনেক মেয়েকে নানা প্রোলভন দেখাত, যেমন বাড়ী পৌঁছে দেওয়া, বাইরে কাজ পাইয়ে দেওয়া, কখন সুলভে বিলাসবহুল জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে, তাঁদের ইচ্ছায় অনিচ্ছায় মেয়ে চালান দিত। এই রকম একটি খারাপ ওয়ার্ডারের নজর পড়ল শোভার ওপর।  ওর সৌন্দর্য্য দেখে তার জিভ লালায় ভরে গেল। সে সুযোগ পেলেই ওকে ডেকে কথা বার্তা বলত। শান্তিমাসী প্রথম ব্যাপারটা লক্ষ্য করে আমাদের ওদের দলের সবাইকে জানিয়ে দিল।
--
সেই প্রথম শোভা হাসিনা মিতাদের সাথে ছুটে এল আমাদের কাছে। শোভাকে ভাল করে সব ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলা হল। ও প্রথমে খুব ভয় পেয়ে গেল। ওকে সকলে মিলে সাহস দিয়ে বলল," ভয় পেলে আরও পেয়ে বসবে, সাহস রাখ। সব সময় আমাদের সকলের মাঝে থাকবি। তোকে একা ডাকলেই কাউকে সাথে নিয়ে যাবি, পারত পক্ষে ওর ধারে কাছে যাবি না। " একদিন যখন সেই ওয়ার্ডার শোভাকে ডেকেছে দেখেই, শান্তিমাসি সঙ্গে গিয়ে হাজির, "কি গো মা,আমাদের ডাহেন ক্যান, কি কইবেন কন, আমাগো আবার ম্যাট্রন মা অনেক কাম কর্থে কৈছেন। শ্যাষ না হইলে জিগাইলে আপনার কথা কইতে লাগব। " জোঁকের মুখে নুন পড়ল। শোভাকে উনি দালালির ক্ষেত্রে মেট্রনের সাথে ভাগ করতে রাজী নন, তাতে লাভের গুন পিঁপড়ে খেয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি বললেন," না না, মেট্রনমার  তোমাদের কাজের কথাটাই মনে করিয়ে দিচ্ছিলাম।" কিন্তু এভাবে কদিন ঠেকান যাবে, আমরা মনে মনে প্রমাদ গুনছিলাম।
---
এবার বিপদ এল অন্য দিক দিয়ে। জেলে ছেলেদের ওয়ার্ড থেকে  সাজাপ্রাপ্ত বন্দীরা মেয়েদের ওয়ার্ডে নানা কাজে আসত, সেই সময় মেট্রনের দালাল হয়ে যাওয়া মেয়েরা দালাল ওয়ার্ডারদের তদারকিতে তাদের সাথে প্রেম ও মাখামাখি করত। চিঠিপত্র চলাচালি চলত। অনেক সময় ত্রিকোণ, চতুস্কোন ইত্যাদি নানা প্রেমের ফলে মেয়েদের মধ্যে ঝগড়া মারামারি হত। শোভা ফেঁসে গেল এই গোলমালের মধ্যে। তার হাতের লেখা সুন্দর, সে পড়াশুনা জানা মেয়ে। প্রেমে পড়া দালাল মেয়েরা সবাই তার কাছে চিঠি লেখাতে আসত। সুন্দর হস্তাক্ষরে মন মাতাল করা ভাষায় প্রেমপত্র লিখে দিত সবাইকে। ওর বন্ধুরা আর  আমরা সকলে বারণ করা সত্ত্বেও শোভা  প্রেমপত্র লেখা ছাড়তে পারল না," আমার মনে হয় যখন আমি প্রথম ওই ছেলেটাকে ভালবেসেছিলাম, তখন যেন ওকে চিঠি লিখছি, বিয়ের প্রথম দিনগুলিতে যেন বরকে চিঠি লিখছি ,এইটুকু ভাল লাগা ছাড়া আর কি আছে আমার,বল তোরা। " "কিন্তু ধরা পড়লে তোরই বিপদ হবে, কেউ কিন্তু স্বীকার করবে না। "
ভবি ভোলবার নয়।
---
অবশেষে মীরাকে লিখে দেওয়া চিঠি পড়ল হামিদার হাতে। হাতের লেখা যে শোভার বুঝতে দেরী হল না, হামিদাও যে অনেক চিঠি লিখিয়েছে। সে শোভাকে শাসাতে লাগল," আজ লক আপ হোক না, কি করি দেখবি।" ভয়ে শোভা আর তার বদ্ধুরা ছুটে এলো আমাদের কাছে। " আমাদের দরজা তো সারাক্ষণ বন্ধ থাকে। আমরা তো তোদের কাছে যেতেই পারব না। আর লক আপের পর ওরা কিছু করলে তো তোদের সবাইকে দল বেঁধে প্রতিবাদ করা ছাড়া কোন পথ নেই। ভয় পেলে চলবে না। সবাই মিলে ওকে ঘিরে থাকিস। "  
---
সেদিন রাতে হাজতি নম্বর থেকে প্রচন্ড চিৎকার চ্যাঁচামিচি শোনা গেল। পরদিন সকাল হতে মেয়াদী নম্বরের জালনায় আমরা পালা করে হাজির থাকলাম, শোভারা কেউ এল না। মেয়াদী ঘরের মাসিদের সাথেও কথা বলা যাচ্ছে না। কারণ একজন না একজন দালাল সব সময় নজর রাখছে। সারাদিন ওই ভাবে গেল, সারা ফিমেল ওয়ার্ড যেন থম থম করছে। রাতে একজন ভাল ওয়ার্ডারের ডিউটি পড়ল আমাদের ডিভিশন ওয়ার্ডে। তাঁর মুখে শুনলাম রাতে হামিদা দলবল নিয়ে শোভাকে মারতে চেষ্টা করেছিল ,তবে তার বন্ধুরা পাল্টা রুখে দাঁড়িয়েছে। হাজতী নম্বরের অন্য অনেক  মাসীরাও শোভাদের পক্ষে ছিল। মেট্রনের কাছে হামিদা নালিশ করার পর মেট্রন হেড জমাদার আর মেয়ে ওয়ার্ডারদের নিয়ে শোভাকে পাগল বাড়ীতে দিয়েছে, মিতা আর মদিনাকে পাগলবাড়ীর মেটের ঘরে রেখে দিয়েছে।
---
পরদিন আমরা কয়েকজন ডাক্তারদের আর ওয়েলফেয়ার অফিসার কে ব্যাপার টা জানালাম। তাঁদের মধ্যস্থতায় দিন ২/১ বাদ দিয়ে মিতা হাজতী নম্বরে ফিরে আসে। মদিনা আর শোভা পাগলবাড়ীর মেটের ঘরে আছে। মদিনার নন ক্রিমিন্যাল লুনাটিক কেস ছিল বলে মেট্রন সেই সুযোগ টা নিয়েছে। আর শোভা মিতাকে বলেছে হাজতী নম্বরে ফিরলে হামিদারা ওকে মেরে ফেলবে। তাছাড়া ওখানে থাকলে খারাপ ওয়ার্ডারটার কুদৃষ্টির হাত থেকেও বাঁচবে। " কিন্তু জেলের কুচক্র যে কোন কাউকেই ইচ্ছে করলে  তার অমতে হাসিনার মত চালাকি করে বার করে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দিতে পারে না জানি কোন অন্ধকারে।
---
আমরা ভেবে দেখলাম আপাতত শোভার পক্ষে এটাই ভাল। অবশ্য জেলখানায় সব ভালই সাময়িক। এখানে চূড়ান্ত ভাল আর চূড়ান্ত মন্দের খেলা চলে অনবরত। এখানে একদিকে একটুরো রুটির জন্য মানুষ দালালি করে, অন্যদিকে এক মা তার বুকের দুধ অন্যের সন্তানকে খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখে, নিজের ভাগ অন্যেকে নির্বিচারে দান করে। এখানে কত মানুষকে পিটিয়ে মেরে রাতারাতি গায়েব করে দেওয়া হয়েছে ,অনাহারে মরেছে কত পাগল। জেলের প্রতিটি কোনে শোনা যায়, জানোয়ারের চেয়েও অধম অবস্থায় রাখা পাগলদের গোঙানি, দুঃখী মানুষের হাহাকার, মীরা,শোভাদের মত মেয়েদের  আর্তনাদ, আর অন্যদিকে শোনা যায় হয়তো বা একটা কুমড়ো চুরির অপরাধে ধৃত গ্রামের মানুষের মেঠোগলায় অথবা  শংকরের মত শিশুগলায় শোষণের আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে গান, রাজনৈতিক দলের স্লোগান আর প্রতিবাদের ও লড়াইয়ের  গান।
--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

পরিশিষ্ট
******
কাগজে দেখেছিলাম কালীঘাটের ধর্ষিতা ভিখারিনী শিশুদুটিকেও ভিক্টিম হিসাবে পুলিশ কাস্টডিতে নেওয়া হয়েছে। তাদের ভবিষ্যৎ সম্ভবত মিতা, শোভা, হাসিনাদের মত সেফ কাস্টডি হিসাবে কারেকশন হোমে (যা নাকি জেলের বর্তমান নাম, আদতে একই জিনিষ, কয়েনের এপিঠ আর ওপিঠ ) নেওয়া হবে আর তাদের ভাগ্যেও একই পরিণতি লেখা আছে,একটু একটু করে তিলে তিলে নরকের আগুনে পুড়বে, শেষে অন্ধকারের অতলে হারিয়ে যাবে। তাই মনে হয় পুরো ব্যবস্থাটিকে নতুন করে ঢেলে না গড়লে সমাজের বুকের এই ক্ষত থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া অসম্ভব।
---------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------















  

22 Nov 2019

কর্ষিত জমিন

কর্ষিত জমিন
************
সত্তর সালের ডিসেম্বর মাস, অফিস টাইম, স্টেশনের লোক্যাল ট্রেনগুলিতে উপচে পড়া ভীড়। দুটি কিশোর আর একটি কিশোরী ধস্তাধস্তি করছে হাওড়াগামী ট্রেনে ওঠার জন্য, কিন্তু কিছুতেই একসাথে ট্রেনে উঠতে পারছে না। একজন ওঠে তো বাকী দুজন নীচে থেকে যায়, ফলত প্রথম জনকেও নেমে আসতে হয়। এমনিতেই এখান থেকে হাওড়ার ট্রেনের সংখ্যা কম। শেষে তারা ঠিক করে স্টেশনের বেঞ্চে বসে নিজেদের কাজের কথা বার্তা সেরে নিয়ে অফিস টাইমের ভীড় কমলে ট্রেনে ওঠার চেষ্টা করবে। একটু পরে ভীড় কেটে গেল বটে পরের ট্রেন প্রায় ঘন্টা খানেক বাদে। ট্রেনের অপেক্ষায় থেকে, নিজেদের মধ্যে কথা বার্তা বলতে থাকে।
--
কপাল মন্দ ! জাঁদরেল এক টিকিট চেকার এসে তাদের ধরে বলে তারা নিশ্চই বিনা টিকিটে ট্রেনে এসেছে। স্বভাবতই তারা প্রতিবাদ জানায় ,"আমরা হাওড়া স্টেশনের ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছি, এইতো আমাদের কাছে হাওড়া যাওয়ার টিকিট আছে।" "তাহলে তোমরা কর্ড লাইনের ট্রেনে বিনা টিকিটে এখানে এসেছ, হাওড়ার টিকিট কেটে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছ। অনেকক্ষন ধরে তোমাদের আমি লক্ষ করছি, এখানে বসে গল্প করছ।" " হ্যাঁ ,তা করছি কারণ অফিস টাইমের ট্রেনে এত ভীড় যে আমরা উঠতে পারছিলাম না।" "তোমরা সব বিশ্ব বখাটে ছেলেমেয়ে, টিকিট ফাঁকি দিয়ে এখন গল্প বানাচ্ছো। চলো অফিসে, স্টেশন মাস্টারের ঘরে।" "ঠিক আছে চলুন ", বলে তিনজন চেকারের পেছন পেছন স্টেশন মাস্টারের অফিসে যায়।
--
সেখানে বেশ জনা কতক ট্রেনের কর্মচারী বসেছিলেন। দু /চার জন উৎসাহী লোকজনও জুটে গেল। নানা রকম টিকা টিপ্পুনি শুরু হয়ে যায়। "কিহে বিনা টিকিটে ট্রেনে সফর করছ "  "ওহে, এই বয়সেই প্রেম করছো ", " কি বেহায়া মেয়ে দেখেছেন, একজন দুটোকে নাচাচ্ছে ", ইত্যাদি ইত্যাদি। ওরা তিন জন প্রতিবাদ করে উঠলো, " আমরা মোটেও বিনা টিকিটে ট্রেনে চড়িনি, আমাদের সাথে টিকিট আছে ", "কেন আজেবাজে কথা বলছেন, আমরা বন্ধু, এক পাড়ায় থাকি।"
এই ভাবে তর্ক বিতর্ক চলে, ঝামেলা বেশ পাকিয়ে উঠল। কেউ বলে আচ্ছা 'ধড়িবাজ', কেউ বলে 'বেয়ারা, বখাটে ', কেউ বলে 'কান ধরে ওঠ বস করান।'  শেষ পর্যন্ত স্টেশন মাস্টার বলেন, "কই দেখিতো হাওড়ার টিকিট কই?"
--
ওদের মধ্যে লিডার গোছের ছেলেটি তিনটি টিকিট বার করে দেয়। স্টেশন মাস্টার টিকিট তিনটি হাতে নিতেই সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ে। একজন  চেকার স্টেশনমাস্টাররে  হাত থেকে টিকিট তিনটে নিয়ে বলে ওঠেন," আরে একি, তোমাদের মধ্যে কে নাবালক ?" লিডার গোছের ছেলেটি বলে,"আজ্ঞে আমি, মানে হাফ টিকিটটা আমার। আর ফুল টিকিট দুটি ওদের দুজনের।" সবাই হো হো করে হেসে ওঠে। কিশোরটিও সবার দিকে তাকিয়ে মোলায়েম একটা হাসি ছাড়ে। এদিকে কিশোরীটি আর অপর কিশোরটি তো অবাক তাদের সাথীর দিকে তাকায় আর ভাবে, "এটা কি উদ্ভট কাজ করেছে আকাশ, আর কেন করেছে ! ওর কি মাথাটাই খারাপ হয়ে গেছে, তিনজন সাবালক তারা, তাহলে কেনই বা দুজনের ফুল টিকিট আর একজনের হাফ টিকিট!" মাথা মুন্ডু খুঁজে পায় না।
--
চেকারটি আকাশ কে ধমকে ওঠে," চুপ করহে বাচাল ছোকরা, এখনই পুলিশে তুলে দেব তিনজনকে। " আকাশ গম্ভীর ভাবে বলে, "না ,তা আপনি করতে পারেন না, আমাকে পুলিশে দিতে পারেন হাফ টিকিটের জন্য, কিন্তু ওদের দুজনকে পুলিশে দিতে পারেন না, ওদের তো ফুল টিকিট আছে। "  সঙ্গে সঙ্গে প্রথম সেই জাঁদরেল চেকারটি লাফিয়ে পড়ে, "দাঁড়াও, তোমার হাফ টিকিট আর ফুল টিকিট বার করছি। প্রথমেই আমি বলেছিলাম বিনা টিকিটে ট্রেন ধরে কর্ড লাইন থেকে এখানে এসেছো, হাওড়ার ট্রেন ধরার জন্য। মেন্ লাইন বলে ভয়ে দুটো ফুল আর একটা হাফ টিকিট কেটেছ , আর মিথ্যা কথা বলেছ। " আকাশ বলে." আমরা মিথ্যা কথা মোটেও বলিনি। "
--
এবার কিশোরী আর অন্য কিশোরটি ময়দানে নামে," দেখুন,ও খেয়াল করেনি। নাহলে দুটো ফুল টিকিট কাটল যখন এক তখন একটা হাফ কাটবে কেন! আমরা হাফ টিকিটের বদলে আর একটা ফুল টিকিট কেটেঁ নিচ্ছি। আমাদের বিরাট ভুল হয়ে গেছে, মাফ করে দিন। " "কভি নেহি ,পুলিশে তোমাদের দেবই দেব। কদিন জেলে ঘানি টেনে এস তবে তোমাদের শিক্ষা হবে বাছাধন। " কিশোরী টি আস্তে আস্তে স্টেশন মাস্টারের কাছে ঘেসে বলতে শুরু করল," দেখুন মাস্টার  মশাই , আপনিই ভাবুন এই রকম ফাঁকি কেউ দেয়, হয় টিকিট কাটে না, নয়তো তিনটেই হাফ টিকিট কাটে। একসাথে তিনজন সাবালক যাচ্ছি, সেখানে এ রকম বোকামি ইচ্ছে করে কেউ করে !" " আমিও তো বুঝে উঠতে পারছি না, এ কি রকম বুদ্ধি ! আর তুমি মা একটা মেয়ে সঙ্গে আছো, কি যে করি !" জাঁদরেল চেকার টি চেঁচিয়ে ওঠে, "মাস্টারমশাই আপনি নরম হবেন না। ওদের পুলিশেই দিতে হবে। "
--
এবার উপস্থিত মানুষদের মধ্যে দুটো ভাগ হয়ে গেল। কেউ বলে 'পুলিশে দেওয়া ঠিক,'  বিরোধী পক্ষ বলে 'ছেড়ে দিন, অল্প বয়েসের ছেলে মেয়ে, কিছু একটা গন্ডগোল হয়ে গেছে, সঙ্গে একটা মেয়ে আছে'  ইত্যাদি, ইত্যাদি। দু /চার জন আবার বললে, 'কিন্তু সত্যি কি ঘটনা হয়েছে সেটা জানা দরকার।' হটাৎ আকাশ সবাই কে চমকে দিয়ে বলে উঠল, "আমার কাছে দুটো ফুল আর একটা হাফ টিকিটের বেশী পয়সা ছিল না, আমরা তিনজন গরীব মানুষের পার্টি করি, আজ আমাদের কলকাতায় ফিরতেই হবে তাই এ ছাড়া উপায় ছিল না ," আকাশ মুখ খোলার সাথে সাথে অপর কিশোর টি ও তাদের রাজনীতি প্রচার করতে শুরু করে দিল। কিশোরীটি ব্যাগ থেকে পার্টির কাগজ পত্র বার করে বিলোতে থাকল। তিনজন তিনটে গ্রূপ করে তাদের পার্টির মতাদর্শ প্রচার করতে শুরু করে দিল। নির্বাক হয়ে জনতা তাদের কথা শুনলো। কাগজ পত্র পকেটে পুরে ফেললো। অনেকেই বলে ফেলল," সত্যি এই সমাজ টাকে বদলানো দরকার, তোমরা হয়তো পারবে। আমাদের শুভেচ্ছা তোমাদের সাথে থাকল। "
--
ইতিমধ্যে হাওড়াগামী ট্রেন স্টেশনে ঢুকছে। স্টেশনমাস্টার তিনটে ফুল টিকিট ওদের হাতে দিয়ে বলল ,"এ রকম ভুল আর কোরনা, সাবধানে থেক। " জাঁদরেল চেকার টি ওদের সঙ্গে করে খালি কামরা দেখে  ট্রেনে উঠিয়ে দিয়ে বলল ,"সাবধানে যেও ভাই। " আর ট্রেনে উঠেই অন্য কিশোর আর কিশোরী দুজনে মিলে দুদিক থেকে আকাশের দুই কান ধরে টেনে ধরল, "হতভাগা  আমাদের বাঁচিয়ে নিজে শহীদ হতে গিয়েছিলি। তবে জনতা যে সত্যিকারের কর্ষিত উর্ব্বর জমিন, প্রয়োজন শুধু উৎকৃষ্ট বীজের, এটা আবার প্রমান হল।  "
--------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
              










1 Oct 2019

কাশ্মীর

কাশ্মীর
******************

শৈশব বন্দী ভয়ের শেকলে
কৈশোর কে বেঁধেছি কাঁটাতারে
যৌবনের তরে বুলেট বৃষ্টি অকাতরে
প্রবীণ আর বৃদ্ধদের ভরেছি কারাগারে।
-----
তবুও জব্দ হয়নি জনতা
মনোবল ওদের আজও অক্ষুন্ন
মোদের হাতে যে অসীম ক্ষমতা 
প্রতিবাদের ঝড়ে তা অতি নগন্য।
-----
দুস্তরলোভ,পৃথিবীটাকে আস্ত
গিলে খাবার বাসনা মোদের,
কিন্তু দমরুহাতে প্রলয়ঙ্করী
তান্ডবনৃত্য  জনতানটরাজের।
-----
মুক্তির স্বপ্ন ওদের পাখির ডানায়
ডাকাতিয়া বাঁশীর নেশায় মাতাল
রোখে সাধ্য আছে আর কার,সূর্য্য
উঠবে চারিধার করে লালে লাল।
শেষ জয়ের হাসি হাসবে পাহাড়
অত্যাচারীর মুখে গ্রহণের আঁধার।
-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------